Ajker Patrika

হাওরে ধান কাটা: পানি কমায় জাগছে আশা

  • দুদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং পানি কমতে শুরু করায় ধান কাটা ও শুকানোর কাজে গতি বেড়েছে।
  • অনুকূল আবহাওয়া থাকলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে সুনামগঞ্জে ধান কাটা শেষ হওয়ার আশা।
  • সুনামগঞ্জে হাওরে প্রায় ২৩ শতাংশ এবং হাওরের বাইরে ৬৬ শতাংশ ধান এখনো কাটা সম্ভব হয়নি।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হাওরে ধান কাটা: পানি কমায় জাগছে আশা
চারদিকে থইথই পানি। তার মধ্য থেকে কেটে তোলা হয়েছে ধান। নেওয়ার জন্য নৌকাও জোগাড় করা যায়নি। নিরুপায় কৃষক তাই পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে ধানের স্তূপ টেনে শুকনা জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। গতকাল সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কের পাশে ছনুয়ার হাওরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

দুদিন ধরে হাওরাঞ্চলে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। পানিও কমতে শুরু করেছে। ফলে কৃষকের মনে আশার আলো দেখা দিয়েছে। তাঁরা স্বস্তিতে ধান শুকানো শুরু করেছেন। কেউ কেউ পানির মধ্যে থাকা অবশিষ্ট ধান কাটায় গতি বাড়িয়েছেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেছেন, তাপমাত্রা বাড়ায় হাওরে ধান কাটা ও শুকানোর কাজে গতি বেড়েছে। এ রকম আবহাওয়া থাকলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ হবে। তবে সমতল এলাকার ধান কাটতে সময় আরেকটু বেশি লাগবে।

ইয়াহিয়া হাসান সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শাহগঞ্জ গ্রামের কৃষক। মঙ্গলবার শনির হাওরে জলাবদ্ধ জমির কাটা ধান নৌকা থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কাদা-পানিতে দাঁড়িয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। রোদ ওঠায় বেশ স্বস্তি প্রকাশ করছিলেন তিনি।

ইয়াহিয়া হাসান বলেন, ‘আমি প্রায় ৬৫ কিয়ার জমি করছিলাম। এর মধ্যে ৪০ কিয়ারের মতো কাটছি। আর বাকিডা বৃষ্টির পানিতে ডুইব্যা গেছে। যেটুকু কাটা হইছে, এই কাটা মুইটগুলাতেও (আঁটি) গেরা আইছে, পচন ধরছে। বোমা মেশিন (ধানমাড়াই যন্ত্র) দিয়া কিছু ভাঙ্গাইছিলাম, এইডিতেও গেরা আইছে। প্রায় ১০০ মণ ধান নষ্ট হইছে। পানিতে থাকা বাকি ধান কাটতাছি। খলাত যেডি আছে, এইডি শুকাইয়া খানি-খোরাক তোলার চেষ্টা করতাছি।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী কয়েক দিন রোদ থাকলে হাওর একটা স্বস্তির জায়গায় পৌঁছাবে। যদিও কিছু কিছু পয়েন্টে পানি আংশিক বেড়েছে, তবে শঙ্কা নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সোমবার রাতের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর আবাদ করা জমির মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং হাওরের বাইরে (সমতল) ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমি আছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩ হেক্টর (৭৭ দশমিক ২৬১ শতাংশ) ও হাওরের বাইরে ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর (৩৩ দশমিক ৭৯৪ শতাংশ) ধান কাটা হয়েছে। হাওরে প্রায় ২৩ শতাংশ এবং হাওরের বাইরে প্রায় ৬৬ শতাংশ ধান এখনো কাটা হয়নি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়নি। সুনামগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর মারকুলি পয়েন্টে পানি ২২ সেন্টিমিটার এবং নলজুর নদীর জগন্নাথপুর পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বাড়লেও অন্যান্য নদীর পানি সে হারে বাড়েনি। ভারতের মেঘালয় ও আসামেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুবিধপুর ইউনিয়নের আতুখুড়া গ্রামের কৃষক রেজাউল করিম খান বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে রোদ উঠেছে। তাই আমরা ধান শুকাতে দিয়েছি। যদি আর বৃষ্টি না আসে, তাহলে মাড়াই করা ধান ঘরে তুলতে পারব।’ আরেক কৃষক মহিবুর রহমান আকঞ্জি বলেন, ‘অনেক কষ্টে ধান কাটছি। শ্রমিকের অভাবে কাজ ঠিকমতো এগোচ্ছে না। তবু আশা করছি, আবহাওয়া ভালো থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারব।’

হবিগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল বলেন, গত দুদিন বৃষ্টি না হওয়ায় উঁচু জমির ধান কাটতে পারছেন কৃষকেরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি জমির ধানও দ্রুত ঘরে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি এখনো বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর, কেওলার হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধান ডুবে রয়েছে। পানি কিছুটা নামতে শুরু করায় কিছু কিছু এলকায় ধান ভাসতে শুরু করেছে। তবে বেশির ভাগ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। যেসব ধান কাটার পর রোদের অভাবে নষ্ট হচ্ছিল, সেসব ধান কিছুটা হলেও শুকাতে পারছেন কৃষকেরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২ হাজার ৫৯৭ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১৮ হাজার ৫০০।

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর গত সোমবার সকাল থেকে নেত্রকেনায় রোদের দেখা মিলেছে। মঙ্গলবার সারা দিন ছিল ঝলমলে রোদ। ফলে অনেকে কাটা ধান ও গবাদিপশুর জন্য খড় রাস্তায় ও আঙিনায় ত্রিপল বিছিয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। কেউ কেউ পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার পশুখালী এলাকার কৃষক রাজিউল ইসলাম খোকন বলেন, ‘গতকাল সোমবার সকাল থেকে দিন ভালাই যাইতেছে। আজকেও সকাল থেকে রইদ উঠছে। ভিজা ধান নষ্ট শুকাইতে দিছি সড়কে। কিছু ধানে গাছ উইট্ট্যা (অঙ্কুর গজিয়েছে) পড়ছে। কয়েক দিন রইদ দিলে ধানের সাথে গরুর খড়ও শুকানো যাইব।’

খালিয়াজুরী উপজেলার আসদপুর এলাকার কৃষক রায়হান মিয়া বলেন, ‘অর্ধেক ধান পানির নিচে। বাকি অর্ধেক কেটে এনেছি। রোদের জন্য শুকাতে পারছিলাম না। স্তূপে নষ্ট হচ্ছিল। দুদিন ধরে রোদ উঠায় শুকাতে দিচ্ছি। আধা নষ্ট ধানই শুকাচ্ছি। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। পানি কিছুটা কমলে তলিয়ে যাওয়া ধানের মধ্যে কিছু ধান কেটে ঘরে তুলতে পারব।’

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি হয়নি। এতে জেলার সব কটি নদ-নদীর পানি কমেছে। তবে কংস ও উব্দাখালী ও ধনু নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এতে বন্যা বা হাওরের ধানখেতে কোনো প্রভাব পড়বে না।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টি বা বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই।

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আরিফুল ইসলাম সরদার বলেন, দুই দিন ধরে রোদ ওঠায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তাঁদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, হাওরাঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ ধান এখনো কাটা বাকি আছে। আগামী ৮ থেকে ১০ দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কোনো পাহাড়ি ঢল না এলে এই অবশিষ্ট ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন বিশ্বজিৎ রায়, সুনামগঞ্জ; সাইফুল আরিফ জুয়েল, নেত্রকোনা; সহিবুর রহমান হবিগঞ্জ; মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার ও সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত