Ajker Patrika

সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে ঠেলাঠেলি

  • সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় বিরোধী দলের উদ্বেগ।
  • সংবিধানে সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নেই: সরকারি দল
  • সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে বিষয়টি তুলতে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
  • বিরোধীদলীয় নেতাকে নোটিশ দিতে বলেছেন স্পিকার।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে ঠেলাঠেলি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা। ছবি: পিআইডি

সময় শেষ হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের অধীনে এই পরিষদের কথা বলা হচ্ছে, তা আরোপিত এবং জবরদস্তিমূলক।

যদিও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নিজ দলের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ জন্য আগে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জায়গায় বসে সমাধান দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবস ছিল গতকাল রোববার। বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তখন স্পিকার বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বিরোধীদলীয় নেতাকে মাইক দেন স্পিকার। শফিকুর রহমান তখন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থাপনের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। রাষ্ট্রপতির একটি আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয় ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর।

এরপর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান বিরোধদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘আদেশ অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা হওয়ার কথা। কিন্তু সে সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে আজ। অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

বিরোধীদলীয় জোটের এমপিরা জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুসারে এমপি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান বলেন, এই আদেশ অনুসারে তাঁরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না, সেটা জায়েজ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস। সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউট্রাল জেন্ডার হতে পারে।’

এই আদেশটিকে ‘আরোপিত’ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ ছাড়া সব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না, বিধায় তা করেননি।

এখন বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা যদি সাংবিধানিক হয়, তবে সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবেন; কিন্তু তাঁদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাধ্যতামূলক নয়। আবার সার্বভৌম সংসদ এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা বিচার বিভাগে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা সংবিধানের লঙ্ঘন হবে। সুতরাং উভয় দিকে লক্ষ্য রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে এগোতে হবে।

সালাহউদ্দিন আরও বলেন, ‘এখন যদি বলা হয় যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে সাংবিধানিক দায়িত্ব, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।’

গণভোটের অধ্যাদেশ ও গণভোটের বিষয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ, সেই আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন কোন প্রশ্নে হ্যাঁ এবং কোন কোন প্রশ্নে না বলবে—সে বিকল্প ছিল না। তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে।

তবে সংসদের চলতি অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কারণ ১৩৩টি অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে। কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে আবেগের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে।’

বিষয়টি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তাঁরা সম্মান করেন। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি বলেন, সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনা হতে পারে।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিয়ে নোটিশ দিতে বলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে।

অধিবেশনের মুলতবি শেষে সংসদের গেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘স্পিকারের অনুরোধ অনুযায়ী আমরা নোটিশ দেব। সংসদের ভেতরেই এর সমাধান করতে চাই। কিন্তু কোনো কারণে সংসদের ভেতরে স্বাভাবিক সমাধান না পেলে তখন আমাদের রাজপথে আন্দোলনে যেতে হবে। আমরা তা চাই না, কারণ যেহেতু বিষয়টি উত্থাপন করেছি, স্পিকার বিবেচনায় নিয়ে নোটিশ দিতে বলেছেন, সে ধারাবাহিকতায় এটা চলতে পারে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে আলোচনার প্রস্তাব করেছেন—এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা এটি কার্য উপদেষ্টা কমিটির বিষয় মনে করি না। আমরা মনে করি এটা সংসদের বিষয়। সংসদেই সমাধান হোক।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ইরানের পরমাণু স্থাপনা এখন ধ্বংসস্তূপ, নিরাপদ নৌ চলাচলে আলোচনার পথ খোলা: আরাঘচি

হাদি হত্যা: ফয়সালদের সীমান্ত পার করা ফিলিপ সাংমার স্বীকারোক্তিতে নতুন তথ্য

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দুর্বৃত্তের গুলি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিহত

প্রাকৃতিক দুর্গ ইরান কেন দুর্জেয়, স্থল অভিযানে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র

৫ জেলায় নতুন ডিসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত