Ajker Patrika

হাওরের দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার দাবি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
হাওরের দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার দাবি
জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বোরো ধানের মহাবিপর্যয় ও মৎস্যসম্পদ ধ্বংসকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং ভুল কৃষিনীতি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ। হাওর রক্ষায় সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে দেশের খাদ্য ও আমিষ নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আজ মঙ্গলবার সকালে আয়োজিত ‘হাওরে বোরো ধান বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন: করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। নয়াকৃষি আন্দোলন ও উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। সভায় সভাপতিত্ব করেন উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন উবিনীগের জাহাঙ্গীর আলম জনি। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ব্রি’র সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস, বিএডিসির গবেষণা সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ড. নাজমুল ইসলাম, গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলমসহ বিভিন্ন জেলার কৃষক প্রতিনিধিরা।

বক্তারা জানান, ৮ মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, আগাম বৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে হাওরের প্রায় ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২ লাখ ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ হাওরাঞ্চল থেকে এলেও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার ওপর অতিনির্ভরশীলতা অঞ্চলটিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলে মত দেন তারা।

সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, এক সময় হাওরে স্থানীয় জাতের ধান যেমন টেপি বোরো ও রাতা বোরো চাষ হতো, যা সেচ ছাড়াই উৎপাদন সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে কৃষকদের সেচ, সার ও কীটনাশকনির্ভর ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের ধান চাষে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব আধুনিক জাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের নামে হাওরে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার আনা হলেও এবারের দুর্যোগে কাদা ও পানির কারণে এসব যন্ত্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

সভায় আলোচকেরা হাওরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সড়ক বিভাগের নির্মিত ৩১১টি বাঁধ এবং কিশোরগঞ্জের ‘অলওয়েদার রোড’ হাওরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ক্ষতি বাড়ছে। এ ছাড়া গত এক দশকে হাওরে মাছ আহরণ ২ দশমিক ৩১ লাখ মেট্রিক টন থেকে কমে ১ দশমিক ২৮ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে বলেও জানানো হয়। তাদের মতে, বোরো চাষে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ২৫ শতাংশ বর্ষার পানিতে মিশে মাছ ও জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করছে।

শ্রমিক সংকটের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে অন্য জেলা থেকে শ্রমিক আসা কমে গেছে। ফলে বৃষ্টির সময় যন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়লে উচ্চ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না এবং কৃষকেরা পাকা ধান ঘরে তুলতে পারছেন না।

সভা থেকে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- বোরো ধানে আধুনিক কৃষি পদ্ধতির অতিব্যবহার পুনর্মূল্যায়ন, কৃষি-মৎস্য-প্রাণিসম্পদ রক্ষায় সমন্বিত ‘হাওর রক্ষা পরিকল্পনা’ গ্রহণ, রাস্তা-বাঁধ-ব্রিজ নির্মাণের জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব যাচাই এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা চালু করা।

বক্তারা বলেন, কেবল ধান নয়, হাওরের মাছ ও প্রাণিসম্পদ রক্ষা করতে না পারলে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এ জন্য আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত