
সার নিয়ে চারদিকে সমস্যা হচ্ছে। চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। এই দুশ্চিন্তার মধ্যে তাঁদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। একলাফে ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ২০ টাকা। আজকের দিনে যন্ত্রনিভর কৃষিতে জমি প্রস্তুত, সেচ দেওয়া, ফসল কাটা, মাড়াইসহ প্রায় সব কাজে জ্বালানি হিসেবে ডিজেল অপরিহার্য। কৃষকেরা বলছেন, সার, বীজ ও কীটনাশকের চড়া দামের কারণে এমনিতেই চাষাবাদ করে লাভ থাকে না, এর ওপর ডিজেলের বাড়তি দামে তাঁদের কষ্ট আরও বাড়ল।
ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে, কঠিন সংকটে পড়বেন কৃষকেরা। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। কৃষকদের রক্ষায় সরকারের এগিয়ে আসা দরকার। লোকসান পুষিয়ে নিতে তাঁদের নগদ অর্থসহ প্রণোদনা দেওয়া উচিত।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বছরে মোট ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা আছে। এর প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। আগের দামে বছরে ডিজেলে কৃষকের ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় সেই ব্যয়
বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
দেশে মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে, যা সম্পূর্ণ সেচনির্ভর। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রায় ১৬ লাখ শ্যালো মেশিনসহ ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করেই ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে ডিজেলের এই বাড়তি দাম সরাসরি বোরো ধানের উৎপাদন খরচে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
ধানের জেলা হিসেবে খ্যাত নওগাঁ। ডিজেলের দাম বাড়ায় এই অঞ্চলে সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বোরো, আমন কিংবা সবজি চাষ—সবক্ষেত্রে এখানকার কৃষকদের ডিজেলচালিত সেচ ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করতে হয়। ডিজেলের দাম বাড়ায় ফসলভেদে উৎপাদন খরচ ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সামগ্রিক খরচ আগের তুলনায় দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এত খরচ করে ফসল ফলানোর পর ন্যায্য দাম মিলবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
নওগাঁ সদর উপজেলার হাসাইগাড়ী এলাকার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, কীটনাশক আর বীজের দাম তো আগেই বাড়ছিল। এরপর চড়া দামে সার কিনতে হলো। আর এখন ডিজেলের দাম বাড়ানোয় জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
রংপুরের তারাগঞ্জের ফকিরপাড়া গ্রামের কৃষক নুর আলম বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়িল ২০ টাকা। আর হামার হিসাব করনো একরে বোরো আবাদ খরচ বাড়বে দুই হাজার টাকা। সরকারি প্রতি হামার দাবি ধানের দামটাও যেন বাড়ায়।’
ডিজেলের দাম বাড়ার পর ঠাকুরগাঁওয়ে সেচপাম্পমালিকেরা প্রতি ঘণ্টার সেচ ভাড়া ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করেছেন। ভাড়া বাড়ানোর কারণ জানিয়ে রাণীশংকৈল উপজেলার সেচপাম্প মালিক ও চাষি লুৎফর রহমান বলেন, দোকান থেকে ১৩৭-১৩৮ টাকায় ডিজেল কিনে আগের দামে পানি দিলে লোকসান হয়, বাধ্য হয়েই ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়ছে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপসাড়া মহল্লার কৃষক রফিকুল ইসলাম রঞ্জু এবার ৯ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তিনি জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার পর পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষের খরচ বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে। শুধু জমি প্রস্তুত করতেই বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। চারা রোপণ ও শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে।
কালাই পৌরসভার কৃষক জামাল উদ্দিন সরকারের হিসাবে, গত বছর বিঘাপ্রতি জমি চাষ ও চারা রোপণে খরচ ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার টাকায়। দুই খাত মিলিয়ে তাঁর অতিরিক্ত ব্যয় ৮০০ টাকা।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালা গ্রামের কৃষক বাবুল লস্কর আমন চাষ করেছেন। কিন্তু লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। এই কৃষক জানান, এখন এক মণ ধান প্রায় ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের দাম মণপ্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা হলে ধান চাষ করে কিছুটা লাভ হতে পারে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার কৃষক রঞ্জু বাবু জানান, আগের দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরই পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষের খরচ বেড়েছিল। এবার আবার তেলের দাম বাড়ায় হালচাষের খরচ আরও বাড়বে। তাঁর আক্ষেপ, ‘তেলের দাম বাড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ধানের দাম বাড়ে না।’
সামনে আমন ধান কাটা হবে। এর পরপরই শুরু হবে বোরো মৌসুম। ধান কাটা কিংবা মাড়াই করতে গেলেই দরকার হয় যন্ত্রের জ্বালানি তেল ডিজেল।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কাকুরাইল গ্রামের কৃষক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘সামনে আমন ধান কাটার সময়। ধান কেটে মাড়াই করতেও মেশিন ব্যবহার করা হয়। আর মেশিন ব্যবহার করলে তো তেল লাগবে। আগে যেখানে তিন-চার শ টাকা লাগত, এখন লাগবে চার-পাঁচ শ টাকা করে।’ বোরো মৌসুম নিয়েও শঙ্কায় আছেন এই কৃষক। তিনি বলেন, এবার বন্যা হয়নি। আগামী বোরো মৌসুমে তাই পানিসংকট থাকবে। সেচের জন্য তখন ডিজেল ব্যবহার করতে হবে। এতে বোরো আবাদ খরচ বাড়বে।
ফেনী অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে মোটামুটি ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। তাই আমন আবাদে সেভাবে সেচের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বর থেকে বোরো ও রবি ফসলের আবাদ শুরু হলে সেচ, জমি চাষ ও পরিবহন খরচ বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের কৃষক আজগর আলী বলেন, ‘রবি ও বোরো চাষ শুরু হলে সেচের প্রয়োজন হবে। তখন ডিজেলের বাড়তি দামের প্রভাব কৃষকেরা সরাসরি টের পাবেন।’
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সব মানুষের ওপর পড়ছে। কৃষকদের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারের দিক থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিজমিতে ডিজেলনির্ভর সেচের পরিবর্তে বিকল্প সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প বসানোর কাজ চলছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, ফেনী ও সিলেট প্রতিনিধি]

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনার সরকারের শেষ কয়েক সপ্তাহের ঘটনা নিয়ে নির্মিত আল-জাজিরা ইংলিশের অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘হাসিনা: ৩৬ ডেইজ ইন জুলাই’। প্রামাণ্যচিত্রটি ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল এমি অ্যাওয়ার্ডস’-এ মনোনয়ন পেয়েছে।
১১ ঘণ্টা আগে
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা টোটাল এনার্জির একটি এলএনজি কার্গো বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে নোঙর করতে পারছিল না। প্রায় ২৪ ঘণ্টায় তিনবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর এলএনজি সরবরাহ ঘণ্টায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যায়।
১২ ঘণ্টা আগে
নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পৃথক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রত্যয়ের উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ বক্তব্যে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে