Ajker Patrika

চট্টগ্রামে ফিরছে ভেরিফিকেশন

শাহরিয়ার হাসান, কক্সবাজার থেকে ফিরে
চট্টগ্রামে ফিরছে ভেরিফিকেশন

জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের পর ওই পরিচয়ে পাসপোর্ট বানাচ্ছেন কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের সঙ্গে মিলে সক্রিয় একটি চক্র তাঁদের এনআইডি ও পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে শুরু করে চক্রটির বিস্তার কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তিন বছরে শুধু টেকনাফেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া এনআইডি পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের (যাচাই) বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পর সেই সুযোগ নিয়ে চক্রটি মোটা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে, যা উদ্বেগ তৈরি করেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের আবেদন যাচাইয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন আবার চালুর কথা ভাবছে সরকার। ওই সিদ্ধান্তের আগে কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের আবেদন যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব কথা জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশে নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গারা এনআইডি সংগ্রহ করতে পারলেও আলাদা পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে পাসপোর্ট পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্র জারি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকে দেশের নাগরিকদের পাসপোর্ট করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগছে না। এই সুযোগটিই নিচ্ছে অসাধু চক্র। জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি সংগ্রহ করা রোহিঙ্গাদের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে একটি চক্র।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বহিরাগমন অনুবিভাগ) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভেরিফিকেশন ছাড়া খুব সহজেই সবাই পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন। কিছু রোহিঙ্গার হাতে যেহেতু ইতিমধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি চলে গেছে, তাদের জন্যও পাসপোর্ট পাওয়া সহজ হয়েছে। তাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় আলাদাভাবে পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকার চিন্তা করছে।’ তবে জালিয়াতির মাধ্যমে এ পর্যন্ত কতজন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট নিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে অপারগতা জানান তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। শুধু সাবরাং ইউনিয়নেই এর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব এনআইডি তৈরি করা হয়। এসব এআইডি ব্যবহার করে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাঁরা বিভিন্ন দেশে পাড়িও জমাচ্ছেন। তাঁদের অপরাধ প্রবণতার কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জেলায় অন্তত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। টেকনাফে ভুয়া এনআইডি তৈরির হার সবচেয়ে বেশি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার অভিযোগটি সুষ্ঠু তদন্ত করে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এনআইডি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। এবার যুক্ত হয়েছে পাসপোর্ট। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এনআইডি মহাপরিচালকের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব এনআইডি আবার যাচাই-বাছাই করে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এনআইডিগুলো শনাক্ত ও ব্লক করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ভেরিফিকেশন ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।

সূত্রটি বলেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে পাসপোর্টের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৮ অক্টোবর কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে আবেদন যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতার চিত্র দেখা গেছে। সেখানে আবেদনকারীদের শুধু এনআইডি দেখেই নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। চাকরি বা ব্যবসার তথ্য, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি, পরিবারের সদস্যদের পরিচয়সহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী পরিচালক মো. শহিদ উল্যাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এখানে কড়াকড়ি থাকায় রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা অন্য জায়গায় গিয়ে পাসপোর্ট করে থাকতে পারেন। কিন্তু এখানে সেই সুযোগ পাননি। এনআইডি থাকলেই যে পাসপোর্ট পাবেন, তা নয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন না থাকায় আমরা বিভিন্নভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।’

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, জালিয়াতির ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় ব্যবহার করা হয়। এতে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যেমন খুলনা অঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুল খালেকের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, ছবি–সব ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় আরও কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়। এরপর খালেকের পরিচয়ে রোহিঙ্গা পুরুষের জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হয়। তবে এমন ক্ষেত্রে কেউ কেউ আঙুলের ছাপ দিতে গিয়ে ধরা পড়েন, কেউবা অন্য কোনো পর্যায়ে। আর যাঁরা ধরা পড়েন না, তাঁরা পাসপোর্ট পেয়ে যান।’

ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন কিছু রোহিঙ্গা নিজেরাই জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি তৈরি করে নিচ্ছেন বলে তথ্য রয়েছে। এতে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্টের আবেদন করার প্রয়োজন কমে যাচ্ছে এবং জালিয়াতির প্রক্রিয়া আরও সহজ হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রথমে এনআইডি পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যদি পাসপোর্টের আবেদনেও পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু করা হয়, তবে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট পাওয়া কমানো সম্ভব হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত