Ajker Patrika

ঈদের ছুটিতে মেঘ-পাহাড়ের দেশে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম 
ঈদের ছুটিতে মেঘ-পাহাড়ের দেশে

শুভ্র মেঘের ভেলা উড়ে যায় আপন গতিতে। কখনো আবার কালো মেঘরাশি জমাট বেঁধে থাকে দূর আকাশে। দৃষ্টির সীমায় ধরা পাহাড়ের ঢেউ। ঝিরঝির বাতাসের আলিঙ্গন। অপার্থিব সৌন্দর্যের সূর্যোদয়ের নান্দনিক দৃশ্য দেখার ফাঁকে, হঠাৎ মেঘের আবরণে শরীর ঢেকে যাওয়া—এমনই সব নয়নাভিরাম দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে এলাম, প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট ওপরে সবুজ পাহাড়ের বুকে গড়া এক জুমঘরে বসে। আপনারাও এই ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত। বন্ধুদের সঙ্গে ছুটলাম বান্দরবানের আলীকদম। রাত পেরিয়ে ভোরের আলোয় আঁকাবাঁকা সড়ক ধরে গাড়ি চলছে। দূরের পাহাড়গুলো তখনো অস্পষ্ট। তবে ঝোপঝাড়ের ফাঁক গলে গভীর গিরিখাদ ঠিকই চোখে পড়ে। বান্দরবানে বহুবার গেলেও পথের সৌন্দর্যে বিমোহিত হতেই হয় বারবার। আলীকদম আবাসিক এলাকায় বাস থেকে নেমে নাশতা সেরে মোটরসাইকেলে উঠি। মারায়নতং পাহাড়ের পথ ধরে বাইক ছুটে চলে। পাহাড়ি পথে মোটরসাইকেলের যাত্রী হতে পারাটা বিশেষ আনন্দের। আনন্দটা কোথায়, সেটিই বলছি।

এই পথ সাজেক কিংবা সিন্দুকছড়ির মতো কালো পিচের সড়ক নয়। সরু পথে ইট-সুরকির সোলিং। কোথাও কোথাও সেটি সরে গিয়ে যাচ্ছেতাইভাবে ইটগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিংবা স্তূপ হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে আবার ডানে-বামে খাদ। চালকের পরবর্তী যাত্রী ধরার তাড়াহুড়ো। এমন পরিস্থিতিতে বাইক পাহাড় বেয়ে ওপর দিকে উঠছে। এতক্ষণে বুঝতে পারছেন, নিশ্চয় আনন্দটা কিসে! এই আনন্দে ভেসে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট ওপরে গিয়ে নামলাম।

বাইকার নামিয়ে দিয়েই চলে গেলেন। আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। জুমঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ২০০ ফুট নিচের দিকে নামতে হবে। শুরু হলো হাইকিং। চোখে ধরা পড়ল মাতামুহুরী নদী। ওপর থেকে নদীটি সুতার মতো লাগল। তবে জুমঘরটা দৃষ্টির সীমায়। হুট করে সাদা মেঘের দল ঘরটা ঘিরে ফেলল। প্রকৃতি যা কিছু করে, তা তার আপন খেয়ালেই। পরেরবার না-ও করতে পারে। তাই কোনো দৃশ্য হারাতে রাজি নই।

জুমঘরে আমাদের স্বাগত জানাল এক বন্ধু। চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে মুহূর্তে সারা রাতের বাসযাত্রার ক্লান্তি উবে গেছে। তাঁবুতে ব্যাগ রেখে প্রকৃতির পিছু নিই। ভ্রমণবন্ধুরা উল্লাসে মেতে ওঠে। বেলা গড়ায়। আমাদের ইচ্ছা হলো, মাতামুহুরী নদীতে গোসল করব সবাই। যেমন কথা তেমন কাজ। প্রায় ১ হাজার ফুট নেমে বাঘের ঝিরি হয়ে তবেই পৌঁছানো যাবে মাতামুহুরীতে। নামতে শুরু করলাম আমরা সবাই। নামতে নামতে একসময় মনে হলো, এই পথে ট্র্যাকিং না করলে ভ্রমণের অনেক কিছুই আমাদের অপূর্ণ থেকে যেত।

বেশ কিছুক্ষণ হাইকিং-ট্রেকিং করার পরে বিশাল সেগুনবাগানের দেখা পাই। প্রাচীন সব সেগুনগাছ। সে এক অন্য রকম ভালো লাগা। সেগুনের ছায়াঘেরা পথে হাঁটতে হাঁটতে বাঘের ঝিরি পার হয়ে নদীর দেখা পাই। বর্ষার প্রমত্তা পাহাড়ি মাতামুহুরী নদী এখন নিষ্প্রাণ। এর বুকজুড়ে এখন চলছে চাষাবাদ। কোমরসমান পানিতে নেমে যাই। চলল অনেকটা সময় নিয়ে গোসল করা। আবারও উঠতে হবে প্রায় হাজার ফুট ওপরে। মাল্টা, কমলা আর আমবাগানের পাশ দিয়ে হাইকিং করে যাচ্ছি। যেতে যেতে এবার ট্রেকিং করার পালা।

ক্যাম্পিং সাইটে ফিরেই দেখি, গুছিয়ে রাখা হয়েছে দুপুরে খাবার—রাজহাঁস ভুনা ও আঠালো খিচুড়ি। আহা! খেয়েদেয়ে তাঁবুতে খানিকটা বিশ্রাম নিয়েই সবাই মিলে চলে যাই সবচেয়ে উঁচুতে থাকা জুমঘরে। খুনসুটি হয় মেঘের সঙ্গে। আড্ডা জমে ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বারবিকিউ প্রস্তুতি শেষ। আকাশে ততক্ষণে তারার মেলা। জ্বলজ্বল করে আলো ছড়াচ্ছে। একটা সময় সবাই ঘুমের বাড়ি পাড়ি জমাই।

সবার ঘুম ভাঙে সুবহে সাদিকের সময়। পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে লাল আভা ছড়িয়ে। এমন সূর্যোদয় দেখার অনুভূতি আসলে লিখে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুধু এতটুকুনই বলা যায়, যাঁরা এই জনমে এখনো এমন সূর্যোদয় দেখার সুযোগ পাননি, তাঁদের অনেকটাই অদেখা থেকে যাবে জীবনের। তাহলে এবার দেখেই আসুন পাহাড়চূড়ায় বসে লাল আভা ছড়ানো সূর্যোদয়।

ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ও মাসুম

যাবেন যেভাবে

ঢাকা থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের আলীকদম বাসে যাওয়া যায়।

থাকা-খাওয়া

লামাবাজার এবং আলীকদমে হোটেল, কটেজসহ পাহাড় চূড়ায় বেশ কিছু রিসোর্ট, জুমঘর ও ক্যাম্পিং সাইট রয়েছে। যাঁরা রোমাঞ্চকর পরিবেশে থাকতে পছন্দ করেন, তাঁরা জুমঘর কিংবা তাঁবুতে থাকতে পারেন। আপনার নিরাপত্তাসহ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখার প্রস্তুতি

চাঁদ দেখা যায়নি, সৌদি আরবে ঈদ শুক্রবার

পটিয়ায় ৩ বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত অন্তত ১৫

ইরানে মাটির নিচে নতুন পারমাণবিক কেন্দ্রের সন্ধান দিল আইএইএ

উল্টো পথে প্রাইভেট কার যেতে বাধা দেওয়ায় ৩ পুলিশকে মারধর, যুবক গ্রেপ্তার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত