Ajker Patrika

যেসব ভুলে আরও রোমাঞ্চকর হলো বেইলির ভ্রমণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ২২: ২৬
যেসব ভুলে আরও রোমাঞ্চকর হলো বেইলির ভ্রমণ
ভ্রমণ সাময়িকী ‘লোনলি প্ল্যানেট’-এর নিয়মিত লেখক বেইলি ফ্রিম্যান। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট

আমাদের অনেকের কাছেই বাইরের প্রকৃতির রোমাঞ্চকর অভিযানগুলো এক দূর আকাশের স্বপ্ন বলে মনে হয়। আমরা ভাবি—আমাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, উপযুক্ত সরঞ্জাম নেই, কিংবা আমরা ভুল করার ভয়ে প্রকৃতির বুকে পা বাড়াতে ভয় পাই। কিন্তু ‘লোনলি প্ল্যানেট’-এর নিয়মিত লেখক বেইলি ফ্রিম্যান আজ বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন—খোলা আকাশের নিচে অ্যাডভেঞ্চারের যে পথ, তা আসলে তৈরিই হয়েছে অজস্র ভুল আর ছোটখাটো বিপত্তির ইট-পাথর দিয়ে। এসব ভুল কাউকে আনাড়ি প্রমাণ করে না, বরং তাঁকে করে তোলে একজন খাঁটি এবং অকুতোভয় অভিযাত্রী।

ভ্রমণে গিয়ে ভুল আর এই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রসঙ্গে বেইলি লিখেছেন, ‘আজ আমি যখন আগুনের পাশে বসে, জোনাকি আর ব্যাঙের ডাককে সঙ্গী করে একাকী ক্যাম্পিং করছি, তখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে হাসি পায়। ছোটবেলায় আমি কোনো ‘বাহিরমুখী শিশু’ ছিলাম না; আমার দৌড় ছিল কেবল পাড়ার সুইমিং পুল আর ফুটবল মাঠ পর্যন্ত। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যখন ট্রাভেল রাইটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়লাম, তখনো শিল্প আর সংস্কৃতি নিয়েই লিখতাম। প্রকৃতির অ্যাডভেঞ্চারকে মনে হতো আমার মতো সাধারণ মানুষের জন্য নয়।’

বেইলি জানান, চিলির পাতাগোনিয়ায় পাঁচ দিনের এক কঠিন ট্রেইল তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে। গাইডসহ সেই ট্রেইলে তিনি পড়ে থাকতেন সবার পেছনে, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি তা সফলভাবে শেষ করেছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই ক্যাম্পিং সরঞ্জাম কিনে একা একা আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে তিন সপ্তাহের জন্য বেরিয়ে পড়েন তিনি। প্রকৃতির সেই রূপ দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন, আর তখনই বুঝতে পারেন—তিনি প্রকৃতির প্রেমে পড়ে গেছেন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর করা কিছু দারুণ ভুল কীভাবে তাঁর ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর আর তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে, সেই গল্পই এবার ‘লোনলি প্ল্যানেট’-এ তুলে ধরেছেন বেইলি।

শেনান্দোয়ার কুয়াশা এবং ভয়ের ওপর জয়

শেনান্দোয়া ন্যাশনাল পার্কের বিখ্যাত ‘বিগ মিডোজ’ ক্যাম্পগ্রাউন্ডে যখন বেইলি আর তাঁর স্বামী পৌঁছালেন, তখন চারপাশটি ছিল মখমলের মতো ঘন কুয়াশায় ঢাকা। একটু নির্জনতার আশায় বেইলি ইচ্ছে করেই মূল ক্যাম্প থেকে বেশ কিছুটা দূরের একটি সাইট বুক করেছিলেন। কিন্তু কুয়াশা আর অন্ধকার মিলে এমন এক ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করল যে, চারপাশের সমস্ত আলো আর শব্দ যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

ভার্জিনিয়ার শেনান্দোয়া ন্যাশনাল পার্কের স্কাইলাইন ড্রাইভ বরাবর ব্লু রিজ পর্বতমালা। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট
ভার্জিনিয়ার শেনান্দোয়া ন্যাশনাল পার্কের স্কাইলাইন ড্রাইভ বরাবর ব্লু রিজ পর্বতমালা। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট

এর ওপর বোনাস হিসেবে ছিল শেনান্দোয়ার ভালুকের উপদ্রবের সতর্কতা! তাঁরা এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি। সামান্য শব্দ শুনলেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি ভালুক এল।

পরদিন সকালে ক্লান্ত শরীরে যখন বেইলি ও তাঁর স্বামী ট্রেইলে হাঁটতে শুরু করলেন, তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। সেই ভীতিজাগানিয়া কুয়াশাটাই যেন রূপ বদলে আমাদের সামনে এক জাদুকরী চরিত্র হয়ে ধরা দিল। কুয়াশা ভেদ করে জলপ্রপাতগুলো নাচতে লাগল, রং-বেরঙের মাশরুমগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেদিন তাঁরা কোনো পাহাড়ের চূড়ার দৃশ্য দেখতে পাননি ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির এই শান্ত, রহস্যময় রূপ তাঁদের মনের ভয়কে এক নিমেষে দূর করে দিয়েছিল।

এই বিষয়ে বেইলির দেওয়া শিক্ষাটি হলো—যতটা ভাবেন, আপনি আসলে আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি সাহসী।

চাটানুগার পাহাড়ে হাত ছেড়ে দেওয়ার গল্প

ভ্রমণের বাইরে বেইলি একজন ‘এরিয়ালিস্ট’ হিসেবে কাজ করেন, অর্থাৎ দড়িতে ঝুলে শারীরিক কসরত করা তাঁর পেশা। তাই যখন চাটানুগায় প্রথমবার রক ক্লাইম্বিং করতে গেলেন, তাঁর অহংকার ছিল আকাশচুম্বী। ভাবলেন, এ আর এমন কী!

কিন্তু বাস্তবে পাথর বেয়ে ওপরে ওঠার সময় যখন মাটি থেকে ৩০ ফুট উঁচুতে গিয়ে তিনি আটকে গেলেন, তখন তাঁর হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। ঘামে শরীর ভিজে যাচ্ছে, পেশিগুলোও ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু নিচে থাকা গাইড তাঁকে বললেন, ‘হাত ছেড়ে দাও, রোপের ওপর ভর দিয়ে একটু জিরিয়ে নাও।’ এই কথা শুনে বেইলি চিৎকার করে উঠলেন, ‘কী বলছ! হাত ছাড়লে তো আমি মরেই যাব!’ কারণ এরিয়াল আর্টে হাত ছাড়ার অর্থই হলো অবধারিত মৃত্যু।

শেষ পর্যন্ত বেইলির অবসন্ন হাত নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিল। তিনি মুষ্টির জোর হারিয়ে শূন্যে ঝুলে গেলাম এবং ভয়ে একচোট চিৎকারও করলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আবিষ্কার করলেন, তিনি দিব্যি বেঁচে আছেন, দড়ি তাঁকে নিরাপদে ধরে রেখেছে! ভয় কেটে যাওয়ার পর তিনি আবার চড়তে শুরু করলেন এবং চূড়ায় পৌঁছালেন। সেখান থেকে টেনিসি নদীর সোনালি-সবুজ বাঁক দেখার পর মনে হলো, এই ভুলের জন্যই তো এই প্রাপ্তি এত মধুর।

এ ক্ষেত্রে বেইলির দেওয়া শিক্ষাটি হলো—নতুন কিছু শেখার শুরুতে আপনি আনাড়ি হতেই পারেন, তাতে লজ্জার কিছু নেই। একবারে না হলে নতুন করে শুরু করুন।

তাহো ও ইউটার মরুভূমি—সাহায্যের হাত বাড়ানো দুর্বলতা নয়

ক্যালিফোর্নিয়ার তাহো ন্যাশনাল ফরেস্টে হুট করে কোনো ম্যাপ বা প্রস্তুতি ছাড়াই ট্র্যাকিংয়ে গিয়েছিলেন বেইলি। আর একটি বরফ গলা পাহাড়ি নদীর পাশে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন—তিনি পুরোপুরি হারিয়ে গেছেন! ফোনের নেটওয়ার্ক নেই, গুগল ম্যাপ কাজ করছে না। চারপাশের ঝোপঝাড় আর গাছের গোলকধাঁধায় আতঙ্ক যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, ঠিক তখনই বরফের ওপর নিজের বুটের ছাপ দেখে কোনোমতে পার্কিং লটে ফিরে আসেন। অতি-আত্মবিশ্বাসে আবারও ট্রেইলে গিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারও পথ হারান। সে যাত্রায় তাঁর বেঁচে ফেরা ছিল অলৌকিক।

প্রথম ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কয়েক মাস পর বেইলি গিয়েছিলেন মূলত ইউটার ‘ক্যাপিটল রিফ ন্যাশনাল পার্ক’-এর মরুভূমিতে ১১ মাইলের একটি ট্রেইলে হাঁটতে। তখন বেইলির সঙ্গে ডিজিটাল ম্যাপ, কম্পাস সবই ছিল। কিন্তু মরুভূমির পথ বড়ই অদ্ভুত, সেখানে কোনো পায়ের ছাপ থাকে না। পাথরকুচির মাঝে ট্রেইল চেনা যখন অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন তিনি তাঁর অহংকার ঝেড়ে ফেলে সামনে থাকা এক জোড়া হাইকারের সাহায্য চাইলেন। লজ্জা ভেঙে সাহায্য চাওয়ায় বেইলি জানতে পারেন, ওই দুই হাইকারের একজন নেভিগেশনে দক্ষ ইগল স্কাউট। ফলে বিপদের বদলে সেই বিকেলটা রূপান্তরিত হলো নতুন বন্ধুত্বের গল্পে আর ইউটার ভিনগ্রহের মতো সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ চষে বেড়ানোর এক দুর্দান্ত রোমাঞ্চে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লেক তাহোর কাছে একটি বনভূমির পথ। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট
ক্যালিফোর্নিয়ার লেক তাহোর কাছে একটি বনভূমির পথ। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট

এ যাত্রায় অভিযাত্রীদের প্রতি বেইলির শিক্ষাটি হলো—কঠিন পরিস্থিতিতে সাহায্যের হাত জোড় করায় কোনো লজ্জা নেই। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ওরেগনের মোহনায় জলনৃত্য

ওরেগনের উপকূলে সঙ্গী সাথিদের নিয়ে একবার সি-কায়াকিং করছিলেন বেইলি। চারপাশের সামুদ্রিক তারামাছ, সিলমাছ আর অ্যানিমোনের সৌন্দর্য ছিল রূপকথার মতো। সহযাত্রীদের ক্যামেরায় তাঁর যে ছবি উঠছিল, মনে হচ্ছিল তিনি প্রকৃতির মাঝে শান্তিতে মগ্ন। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্যটি হলো—মোশন সিকনেসের কারণে বমি চেপে রাখতে তিনি তখন আপ্রাণ লড়াই করছিলেন। আদা দিয়ে তৈরি চুইংগাম চিবিয়ে কোনোমতে তীরে ফিরে বালিতে মাথা গুঁজে বসে রইলেন। ভীষণ আফসোস হচ্ছিল যে শারীরিক সমস্যার কারণে এত সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা মাটি হয়ে গেল।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পরদিন—পাহাড়ি খরস্রোতা ‘রগ রিভার’-এ হোয়াইট ওয়াটার কায়াকিং। আগের দিনের ট্রমা নিয়ে তিনি যখন ইনফ্ল্যাটেবল কায়াকিং বোটে উঠলেন, তখন তিনি নিশ্চিত ছিলেন আজ হয়তো বমি করবেন নয়তো নৌকা উল্টে পানিতে ডুবে মরবেন।

কিন্তু ঢেউয়ের তোড়ে যখন বোট দুলতে শুরু করল, বেইলির শরীরের সমস্ত অ্যাড্রেনালিন হরমোন জেগে উঠল। ভয়ের বদলে এক তীব্র আনন্দ তাঁকে গ্রাস করল। ঢেউয়ের শীতল জলের ঝাপটা আর তীব্র গতি তাঁর মনের সমস্ত জড়তা ধুয়ে দিল। আকাশে ইগল পাখির ওড়া দেখতে দেখতে যখন ক্লাস থ্রি র‍্যাপিড (তীব্র ঢেউ) পার হলেন, তাঁর মুখে তখন চওড়া হাসি। আগের দিনের ভুল আর ভয়কে জয় না করলে ওরেগনের এই সেরা দিনটি তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যেত।

ওরেগনের রগ নদীর খরস্রোত। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট
ওরেগনের রগ নদীর খরস্রোত। ছবি: লোনলি প্ল্যানেট

এবারে বেইলির শিক্ষাটি হলো—সীমানা ভাঙার জন্য নতুন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হোন। এতে আপনি জানতে পারবেন কোন জিনিসটা আপনার জন্য আর কোনটা নয়।

বেইলির মতে, আউটডোর অ্যাডভেঞ্চার বা প্রকৃতির এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণগুলো গ্ল্যামার দুনিয়ার মতো নিখুঁত নয়। এখানে ভুল হবে, কাদা মাখতে হবে, ভয়ে বুক কাঁপবে। কিন্তু প্রতিটি ভুলই আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে একেকটি মেডেলের মতো। তাই ঘরে বসে না থেকে সঠিক প্রস্তুতিটুকু নিন, ভুল করার ভয়কে ছুটি দিন এবং প্রকৃতির প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করুন। প্রকৃতি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত