Ajker Patrika

আয়ারল্যান্ডের অ্যালকোহলমুক্ত রহস্যময় পানীয়, রেসিপি মাত্র দুজনের হাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আয়ারল্যান্ডের অ্যালকোহলমুক্ত রহস্যময় পানীয়, রেসিপি মাত্র দুজনের হাতে
ম্যাকডেইড’স অ্যান্ড সন্স নামের স্থানীয় একটি সফট ড্রিংক কোম্পানি ১৯৬০-এর দশকে পানীয়টি তৈরি করে। ছবি: জনি লিনস্ক

আয়ারল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমের ছোট কাউন্টি ডানিগল। সেখানকার প্রায় প্রতিটি ক্যাফে, পাব ও দোকানে দেখা মেলে একটি অদ্ভুত পানীয়ের—নাম ‘ফুটবল স্পেশাল’। দেখতে বিয়ারের মতো, কিন্তু এতে এক ফোঁটাও অ্যালকোহল নেই। স্বাদে ভ্যানিলা, ক্যারামেল, আদা বা লিকোরিসের আভাস মিললেও ঠিক কী দিয়ে তৈরি, তা জানেন মাত্র দুজন মানুষ।

ম্যাকডেইড’স অ্যান্ড সন্স নামের স্থানীয় একটি সফট ড্রিংক কোম্পানি ১৯৬০-এর দশকে পানীয়টি তৈরি করে। বর্তমানে এর গোপন রেসিপির রক্ষক বাবা-ছেলে এডওয়ার্ড ম্যাকডেইড ও সিমাস ম্যাকডেইড।

এডওয়ার্ড মজা করে বলেন, ‘রেসিপিটা আমি কাউকে দেখাই না। দেখালে তো আমাকে আপনাকে মেরেই ফেলতে হবে!’

আসলে এতে আছে সাত ধরনের অপ্রকাশিত ফ্লেভার। শুরু থেকেই নকল ঠেকাতে উপাদান গোপন রাখা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে গেছে পানীয়টির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি ডানিগলের লেনি নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও মনোরম রামেলটন শহরের ফুটবল ক্লাব ‘সুইলি রোভার্স’ ১৯৬০-এর দশকে বড় দুটি শিরোপা জেতে। তখন বিজয় উদ্‌যাপনে ট্রফির ভেতর মদ ঢেলে সবাই মিলে পান করার রীতি ছিল। কিন্তু ম্যাকডেইড পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন খেলোয়াড়রা যেন মদ না খেয়েও উদ্‌যাপন করতে পারেন।

ম্যাকডেইড পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন খেলোয়াড়রা যেন মদ না খেয়েও উদ্‌যাপন করতে পারেন। সেই থেকে ফুটবল স্পেশালের জন্ম। ছবি: জনি লিনস্ক
ম্যাকডেইড পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন খেলোয়াড়রা যেন মদ না খেয়েও উদ্‌যাপন করতে পারেন। সেই থেকে ফুটবল স্পেশালের জন্ম। ছবি: জনি লিনস্ক

সিমাস ম্যাকডেইড বলেন, ‘আমার দাদা ও তাঁর ভাইয়েরা মনে করতেন, ভালো খেলোয়াড় হতে হলে নমনীয় থাকা দরকার। তাই তাঁরা এমন কিছু বানাতে চেয়েছিলেন, যা ট্রফিতে ভরে সবাই মিলে পান করা যাবে, কিন্তু তা হবে নন-অ্যালকোহলিক।’

সেই থেকে ফুটবল স্পেশালের জন্ম। ইচ্ছা করেই এতে ফেনা তোলার উপাদান যোগ করা হয়, যেন দেখতে বিয়ারের মতো লাগে।

সিমাসের ভাষায়, ‘আমি বলতে ভালোবাসি, জিরো অ্যালকোহল বিয়ার ভাবনারও বহু আগে আমরা সেটাই বানিয়ে ফেলেছিলাম।’

দীর্ঘদিন ডানিগল এলাকার বাইরে পানীয়টি প্রায় অজানাই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিক্রি দ্রুত বেড়েছে। পাঁচ বছরে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানায় কোম্পানিটি।

২০২০ সালে যেখানে বছরে ১৩ হাজার কেস বিক্রি হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার কেসে।

রাজধানী ডাবলিনের একটি কসাইখানার মালিক জেসন কোরিগান বলেন, ‘এটা আমাকে শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়...বরফ দেওয়া লেমনেডের ওপর আইসক্রিম ঢেলে খাওয়ার মতো একটা অনুভূতি।’

ডাবলিনের বাসিন্দা রব কিও বলেন, ‘বড় বহুজাতিক ব্র্যান্ডের বদলে স্থানীয় একটা পানীয়কে সমর্থন করার ভাবনাটা ভালো লাগে। স্বাদটাও একেবারে আলাদা।’

খাদ্য ইতিহাসবিদ ড. মার্টিন ম্যাক কন ইওমাইরে মনে করেন, এ জনপ্রিয়তা কেবল স্বাদের জন্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক টানের ফল। তিনি বলেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মানুষ এখন স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছে—ভাষা, সংগীত, খাবার বা ফুটবল স্পেশাল—সব ক্ষেত্রেই।

ডানিগল ফুড কোস্টের লিন্ডসে রেনল্ডস বলেন, এটা শুধু একটা পানীয় নয়, ডানিগলের সংস্কৃতির অংশ। তাই এর স্লোগানও—ওয়ার্ল্ড ফেমাস ইন ডানিগল।

ফুটবল স্পেশালের জনপ্রিয়তা কেবল স্বাদের জন্য নয়, এটি আয়ারল্যান্ডের সংস্কৃতিরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি: জনি লিনস্ক
ফুটবল স্পেশালের জনপ্রিয়তা কেবল স্বাদের জন্য নয়, এটি আয়ারল্যান্ডের সংস্কৃতিরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি: জনি লিনস্ক

আয়ারল্যান্ডে অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের চাহিদা বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মদ্যপান কমার প্রবণতার সঙ্গেও ফুটবল স্পেশালের উত্থান মিলে গেছে।

রামেলটনের হোটেলকর্মী কেটি ম্যাককালাম বলেন, ‘বারে গেলে অ্যালকোহলের ভালো বিকল্প এটা। আপনি যদি ড্রাইভার হন, সহজেই এটায় হাত বাড়াবেন।’

রামেলটনের পাবকর্মী জর্ডান ম্যাকডেইডের ভাষায়, কাউন্টির বাইরের লোকজনও বিশেষভাবে এটা চেখে দেখতে আসেন।

অনেকে বলেন, না খেয়ে এর স্বাদ বোঝানো যায় না। ম্যাককালাম মনে করেন, রেসিপির রহস্যটাই এর আকর্ষণের অংশ। এটা কেমন, সেটা বুঝতে হলে নিজেকেই চেখে দেখতে হবে।

১৯৮০-এর দশকে কোকা-কোলা বা পেপসির মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো যখন আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল, তখনো ফুটবল স্পেশাল টিকে ছিল কেবল তার অনন্য স্বাদের কারণে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেগ আর আনুগত্যই ছিল এর মূল শক্তি। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) মধ্যে অ্যালকোহল ত্যাগের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার বিকল্প হিসেবে ফুটবল স্পেশাল প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে।

আজ ফুটবল ম্যাচের ট্রফি থেকে শুরু করে পিৎজার দোকান, এমনকি বিদেশের আইরিশ প্রবাসীদের হাতেও পৌঁছে গেছে এই পানীয়। তবু ডানিগলের মানুষদের বিশ্বাস, এর আসল আনন্দ এখনো সেই রুক্ষ, সুন্দর ডানিগলেই। কারণ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারাই এই অদ্ভুত স্বাদের পানীয়টিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত