Ajker Patrika

মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে কেন?

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে কেন?
মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটার বিষয়টি আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

মোবাইল ফোন কানে দিতেই অনেকের পা যেন আপনাআপনি চলতে শুরু করে। ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণ, কখনো বারান্দা, কখনো জানালার পাশে। হাঁটতে হাঁটতেই গল্প, অফিসের আলোচনা কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে লম্বা কথা চলতে থাকে। অনেকেই ভাবেন, এটা বুঝি শুধু অস্থিরতার লক্ষণ। কিন্তু আসলে বিষয়টি বেশ মজার এবং এর কারণ আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

আমেরিকান একাডেমি অব অর্থোপেডিক সার্জনসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ অন্য কাউকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটতে দেখেছেন এবং ৩৭ শতাংশ মানুষ নিজেরাই নিয়মিত এ কাজটি করেন। এটি খুবই সাধারণ একটি আচরণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করে।

চোখে না দেখলেও বোঝার চেষ্টা

সামনাসামনি কথা বলার সময় আমরা শুধু কথা শুনি না, অপরজনের মুখভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি, হাতের নড়াচড়া ও শরীরী ভাষা থেকেও অনেক তথ্য পাই। কিন্তু মোবাইল ফোনে এসব দৃশ্যমান সংকেত থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর মনোবিজ্ঞানী ড. কেন ফোগেল জানান, মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় মস্তিষ্ককে আলাদা করে কল্পনা করতে হয়, অপর প্রান্তের মানুষটি কেমন অনুভব করছে বা কীভাবে কথা বলছে। এই বাড়তি মানসিক কাজকে সহজ করতে মস্তিষ্ক শরীরকে নড়াচড়া করতে উৎসাহ দেয়। হাঁটা বা হাত নাড়ানোর মতো নড়াচড়া মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

চিন্তা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে

অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করলে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে মাথায় আসে। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, বসে থাকার তুলনায় হাঁটার সময় মানুষের সৃজনশীল চিন্তার ক্ষমতা গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। কথোপকথন যখন জটিল হয় বা বেশি মনোযোগ দরকার হয়, তখন মস্তিষ্ক শরীরের পেশিকে কাজে লাগায়। এই শারীরিক নড়াচড়া থেকে পাওয়া শক্তি মস্তিষ্কের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোকে আরও সক্রিয় করে তোলে।

মন হালকা করার উপায়

চলাফেরা শুধু চিন্তার জন্য নয়, আবেগ সামলানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুশ্চিন্তার খবর বা মানসিক চাপ বেড়ে যায় এমন কোনো কল এলে শরীর হঠাৎ সজাগ হয়ে ওঠে। তখন শরীরের ভেতরে এমন কিছু রাসায়নিক বের হয়, যা আমাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত করে। মনে হয়, যেন কিছু একটা করতে হবে, নড়তে হবে বা হাঁটতে হবে। তাই শরীর আপনাআপনি চলাফেরা শুরু করে, যাতে সে চাপটা একটু কমে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারোলিন ওয়াই ওয়েইয়ের গবেষণায়ও দেখা গেছে, ফোনে কথা বলার সময় হাত নড়াচড়া বা হাঁটা মূলত বক্তার নিজের জন্যই উপকারী। এতে চিন্তা কমে আসে এবং মানসিক প্রশান্তির জায়গা তৈরি হয়।

উপকার আছে, তবে সাবধানতাও জরুরি

ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটা একধরনের ‘নন-এক্সারসাইজ থার্মোজেনেসিস’, অর্থাৎ আলাদা করে ব্যায়াম না করেও শরীর নড়াচড়া করলে ক্যালরি খরচ হয়। অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা মানুষদের জন্য এটি কিছুটা হলেও উপকারী। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কথা বলার সময় মনোযোগ আশপাশ থেকে সরে যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে সিঁড়ি, রাস্তা বা ভিড়ের জায়গায় হাঁটলে। তাই মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস থাকলে সেটা ঘরের ভেতর বা পরিচিত, সমতল জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখাই নিরাপদ।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটা শুধু অস্থিরতার লক্ষণ নয়, মস্তিষ্কের একধরনের স্বাভাবিক কৌশলও বটে। তাই পরের বার মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে নিজেকে ঘরের এদিক-ওদিক হাঁটতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে হাঁটাহাঁটির জায়গা বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটু সচেতন থাকলে এই ছোট অভ্যাসটিই হতে পারে মন ও শরীর দুটোর জন্যই উপকারী।

সূত্র: স্ট্যানফোর্ড নিউজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত