Ajker Patrika

ডিজিটাল যুগেও টিকে আছে ৪৭৫ বছরের পুরোনো বইয়ের বাজার

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
প্যারিস শহরের মাঝখানে সেইন নদীর ধারে টিকে আছে সাড়ে চার শ বছরের বেশি পুরোনো এক বইয়ের বাজার। ছবি: উইকিপিডিয়া
প্যারিস শহরের মাঝখানে সেইন নদীর ধারে টিকে আছে সাড়ে চার শ বছরের বেশি পুরোনো এক বইয়ের বাজার। ছবি: উইকিপিডিয়া

বর্তমান যুগে মানুষ বই পড়ার চেয়ে স্ক্রিনে স্ক্রল করতে বেশি অভ্যস্ত। এমন সময়ও প্যারিস শহরের মাঝখানে সেইন নদীর ধারে টিকে আছে সাড়ে চার শ বছরের বেশি পুরোনো এক বইয়ের বাজার। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এই বাজারে যাঁরা বই বিক্রি করেন, তাঁদের বলা হয় বুকিনিস্ত। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এটি শুধু জীবিকা নয়, জীবনের অংশ।

এই বাজারের ৭৬ বছর বয়সী বই বিক্রেতা সিলভিয়া ব্রুই বলেন, ‘এটা শুধু একটা চাকরি নয়, আমার জীবনের অংশ। আট বছর ধরে এখানে পুরোনো বই বিক্রি করছি।’

ইতিহাসের পাতায় বুকিনিস্তরা

প্যারিসের এই বইয়ের বাজারটি শুরু হয়েছিল ১৫৫০ সালে। এখনো সেটি সচল আছে। ছবি: উইকিপিডিয়া
প্যারিসের এই বইয়ের বাজারটি শুরু হয়েছিল ১৫৫০ সালে। এখনো সেটি সচল আছে। ছবি: উইকিপিডিয়া

প্যারিসের এই বই বিক্রেতাদের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৫৫০ সালে। তখন মাত্র এক ডজন ফেরিওয়ালা শহরের কেন্দ্রস্থলে বই নিয়ে বসতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশা বিস্তার লাভ করে, বিশেষ করে ১৬০৬ সালে পঁ ন্যুফ সেতু নির্মাণের পর। বিশ শতকের শুরুতে শহর কর্তৃপক্ষ বইয়ের স্টলগুলোর একটি নির্দিষ্ট রূপ নির্ধারণ করে দেয়। তাতে বলা হয়, সব স্টল হবে একই রঙের—গাঢ় সবুজ। এই দোকানগুলো এমনভাবে তৈরি, যেন নদীর সৌন্দর্য ঢাকা না পড়ে। আজ প্রায় ২৩০ জন বই বিক্রেতা তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছেন এখানে। পুরোনো বই, সমসাময়িক সাহিত্য, খোদাই চিত্র, ডাকটিকিট, ম্যাগাজিন—সবই পাওয়া যায় সেইন নদীর ধারের সেই পুরোনো বইয়ের বাজারে।

পাথরের পুরোনো দালান আর নদীর ঢেউয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এই খোলা আকাশের বইয়ের দোকান যেন এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক সংগ্রহশালা।

বইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা

এই পেশায় ঢোকা সহজ নয়। বুকিনিস্তদের কোনো ভাড়া বা কর দিতে হয় না। কিন্তু রয়েছে কঠোর নিয়মকানুন। শহর কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে স্টল বরাদ্দ দেয়। আবেদনকারীদের জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে লিখে জানাতে হয়, বই নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা কী।

বুকিনিস্তদের সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি জেরোম কালে বলেন, ‘এখানে স্টল পেতে হলে বইয়ের প্রতি আপনার সত্যিকারের দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে হবে। বইকে আপনি আসলেই ভালোবাসেন কি না, সেটা দেখা হয়।’ ২০২৫ সালের অক্টোবরে ১২ জন নতুন বই বিক্রেতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এখানে।

প্রতিটি অনুমতিপত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। সপ্তাহে অন্তত চার দিন স্টল খোলা রাখতে হয়। বিক্রি করা যায় পুরোনো ও ব্যবহৃত বই, কাগজপত্র ও খোদাই চিত্র। সঙ্গে সামান্য পরিমাণে পোস্টকার্ড বা ডাকটিকিট রাখা যায়। অধিকাংশ বুকিনিস্তের বয়স ৫০ বছরের বেশি। প্রায় ৮০ শতাংশ বিক্রেতাই এই বয়সের ঊর্ধ্বে।

নতুন প্রজন্মও আসছে

শুধু বয়স্করাই নন, নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আসছে। ৫২ বছর বয়সে অনলাইন বই বিক্রির পেশা ছেড়ে নদীর ধারে স্টল খুলেছেন ওজান ইয়িগিতকেস্কিন। তিনি বলেন, ‘১৫ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে সাইকেলে করে বই বিক্রি করতাম। বই আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে।’

অন্যদিকে, ৩৫ বছর বয়সী ক্যামিল গুদো ছয় বছর আগে নিজস্ব স্টল খুলেছেন। তিনি কম দামের সেকেন্ড-হ্যান্ড বই বিক্রি করেন। যারা পড়া ছেড়ে দিয়েছে, তাদের আবার বইয়ের কাছে ফিরে আনাই লক্ষ্য। একজন বই বিক্রেতা জানান, ‘একজন তরুণী প্রথমবার এখানে বই কিনেছিল ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। পরে সে জেমস জয়েস পড়েছে। এখন সে নিয়মিত বইয়ের দোকানে আসে।’

জরিপ বলছে, ফ্রান্সে গত দশকে পুরোনো বই পড়ার প্রবণতা বেড়েছে; বিশেষ করে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে।

খোলা আকাশ এবং মানুষের মেলা

বুকিনিস্তরা সারা বছর খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। একটি ভাঁজ করা চেয়ার, ছোট টেবিল—এই নিয়েই তাঁদের কর্মক্ষেত্র। এই স্টলগুলো অনেক মানুষের জন্য প্রতিদিনের আশ্রয়। কেউ হাঁটতে হাঁটতে আসে, কেউ কথা বলতে। ১৫ বছর ধরে বই বিক্রি করা ক্লেয়ার লেরিশ বলেন, ‘একটা পুরোনো পোস্টকার্ডের গল্প শোনাতে পারলে মানুষ খুশি হয়। এই গল্প করা খানিকটা আড্ডা দেওয়া—এটাই এখানকার মূল বিষয়।’ তরুণ পাঠকেরাও এখানে নিয়মিত আসেন। তাঁদের কাছে পুরোনো বইয়ের গন্ধ, ইতিহাস আর আগের পাঠকদের স্পর্শ সব মিলিয়ে এক আলাদা অনুভূতি।

নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ

ই-বুক, অনলাইনে বই বিক্রি—সবকিছুর মাঝেও বুকিনিস্তরা হার মানতে রাজি নন। তাঁদের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বড় হুমকি ছিল ২০২৪ সালের অলিম্পিক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য স্টল সরানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত বুকিনিস্তরা জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হন।

ক্যামিল গুদোর কথায়, ‘প্রতিবছর শোনা যায়, বই বিক্রেতারা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেখুন, আমরা এখনো আছি। আশা করি, আরও অনেক দিন থাকব।’

ডিজিটাল যুগের ভিড়ে দাঁড়িয়ে প্যারিসের বুকিনিস্তরা প্রমাণ করছেন, বই শুধু পড়ার জিনিস নয়, এটি সম্পর্ক, স্মৃতি আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের সেতু।

সূত্র: সিএনএন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে ভর করে আইএমএফের ঋণ থেকে মুক্তি চায় পাকিস্তান

ভেনেজুয়েলার বিনিময়ে ২০১৯ সালেই ট্রাম্পের কাছে ইউক্রেন চেয়েছিল রাশিয়া

বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে ‘গায়েব’ করে দিল আইসল্যান্ড

৬৬ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিচ্ছেন ট্রাম্প

‘ভারতের বাইরে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেললে সেটা ক্রিকেটের জন্য বাজে দেখাবে’

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত