Ajker Patrika

টাকা ছাড়াই কেনাকাটার সুখ! দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
টাকা ছাড়াই কেনাকাটার সুখ! দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’
কোরিয়ার তরুণেরা নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রেখে সাময়িক মানসিক চাপমুক্তির এক চমৎকার ডিজিটাল দরজা হিসেবে বেছে নিয়েছে ডোপামিন সাইটগুলোকে। ছবি: পেক্সেলস

কাগজের নোট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের ব্যালেন্স—কোনোটিই কমবে না। এদিকে শপিং ব্যাগ ভর্তি করার নিখাদ আনন্দটুকু ঠিকই পাওয়া যাবে। বিষয়টি শুনতে অবাস্তব মনে হলেও তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে এটিই এখন মানসিক শান্তি খোঁজার আধুনিক ট্রেন্ড।

দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বর্তমানে ডোপামিন সাইটস নামের এক অভিনব ডিজিটাল ট্রেন্ড বা ইন্টারনেট ফিক্সেশন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মূলত কিছু হাইপার-রিয়েলিস্টিক বা অতিবাস্তবধর্মী ওয়েবসাইট নিয়ে গঠিত। যেখানে ব্যবহারকারীদের কোনো টাকা খরচ না করেই কেনাকাটা, খাবার অর্ডার কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার মতো বাস্তব জীবনের নানান আকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার হুবহু নকল বা সিমুলেশন উপহার দেওয়া হয়। আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয় আর তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে বাস্তব জীবনের শখগুলো পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ঠিক এই সময়ে কোরিয়ার তরুণেরা নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রেখে সাময়িক মানসিক চাপমুক্তির এক চমৎকার ডিজিটাল পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই ডোপামিন সাইটগুলো।

কী এই ডোপামিন সাইট

ডোপামিন সাইট হলো এমন কিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সামাজিক আচার বা কনজাম্পশন কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়। যেমন অনলাইন শপিং, খাবার ডেলিভারি নেওয়া কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে সিগারেট ব্রেক নেওয়া। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বাস্তবে কোনো আর্থিক লেনদেন ঘটে না। বিনিময়ে চূড়ান্ত পণ্যটি কখনোই ব্যবহারকারীর দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।

তরুণেরা কেন বাস্তব জীবন থেকে পালিয়ে এই ভার্চুয়াল শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন, সেই মূল মানসিক বা সামাজিক সংকট আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ছবি: পেক্সেলস
তরুণেরা কেন বাস্তব জীবন থেকে পালিয়ে এই ভার্চুয়াল শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন, সেই মূল মানসিক বা সামাজিক সংকট আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ছবি: পেক্সেলস

‘ফুড নেভার কামস’ নামের একটি ডোপামিন সাইট বেশ জনপ্রিয় দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের কাছে। দেশটির ডেভেলপার মালহীর তৈরি করা এই সাইট দেশটির বড় বড় ই-কমার্স ও ফুড ডেলিভারি অ্যাপের আদলে তৈরি। ব্যবহারকারীরা এখানে রেস্তোরাঁ স্ক্রল করতে পারেন, মেনু তুলনা করতে পারেন, রিভিউ পড়তে পারেন এবং কার্ট ভর্তি করে একটি সম্পূর্ণ ভুয়া অর্ডার প্লেস করতে পারেন। এমনকি লাইভ ম্যাপে একজন ভার্চুয়াল কুরিয়ার বা ডেলিভারি বয় কীভাবে তাঁদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে, তা-ও লাইভ ট্র্যাক করা যায়।

এখানে আছে ভার্চুয়াল স্মোক ব্রেক সাইট। কোরীয় ভাষার একটি স্ল্যাং দিয়ে তৈরি এই সাইট মূলত একটি ভার্চুয়াল ব্রেক রুম। এখানে কোনো সিগারেট না জ্বালিয়েই ব্যবহারকারীরা একটি স্টার্ট বাটন চেপে লাইভ দেখতে পারেন, এই মুহূর্তে আর কারা অনলাইনে আছেন। অপরিচিত ও বেনামি মানুষদের সঙ্গে এক অভিনব এবং চাপহীন সামাজিক আবহে কিছু সময় কাটানোই এর লক্ষ্য।

তরুণেরা কেন এই সাইটগুলোতে এত আগ্রহী

কোরিয়ার তরুণদের এই সাইটগুলোর প্রতি ঝুঁকে পড়ার পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে।

টাকা না বাঁচিয়েই ‘কেনার আনন্দ’

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ডোপামিন শুধু আনন্দের রাসায়নিক নয়, এটি মূলত মানুষের অনুপ্রেরণা, শিক্ষা এবং কোনো পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা বা পূর্বানুমানের সঙ্গে যুক্ত। ‘সাইকোলজি টুডে’ ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, মানুষ যখন কোনো কিছু কেনার কথা কল্পনা করে, তখন তার মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও সুখের অনুভূতি তৈরি হয়, তা অনেক সময় বাস্তবে কোনো কিছু কেনার সমান বা বেশি আনন্দদায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে একটি জিনিস পাওয়ার যে মানসিক সিমুলেশন বা পূর্বানুমান, তা মানুষের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও সুখের অনুভূতি তৈরি করে। ডোপামিন সাইটগুলো খরচের ভয় ছাড়াই তরুণদের এই ‘প্রত্যাশার আনন্দ’টুকুকে সফলভাবে কাজে লাগাচ্ছে।

তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ও খরচের বোঝা থেকে মুক্তি

দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলোর চড়া ডেলিভারি ফি নেওয়ার কারণে তরুণদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। এদিকে মধ্যরাতে তীব্র ক্ষুধা বা কোনো কিছু খাওয়ার ইচ্ছা জাগলে টাকা বাঁচানোর তাগিদে অনেক তরুণ এই অ্যাপ ব্যবহার করছেন। কারণ, কার্টে খাবার জমা করে অর্ডার করার ভান করলেই তাঁদের মানসিক চাপ কমে যায়। এদিকে মনে হয় সত্যি সত্যিই অর্ডার করা হয়েছে। কিছু কিছু সাইট আবার অর্ডার না করার জন্য কত ক্যালরি বা ক্যাশ বাঁচল, তার মেসেজ দেখিয়ে ইতিবাচক ফিডব্যাক দেয়।

একাকিত্ব দূরীকরণ এবং সামাজিক আচারের সান্ত্বনা

খাবার অর্ডার করা বা কাজের ফাঁকে সিগারেট ব্রেক নেওয়া শুধু ব্যক্তিগত কাজ নয়। এগুলো দরকারি বিষয়। পরীক্ষার চাপের সময় বা পড়াশোনায় মনোযোগ হারালে তরুণদের অনেকে ভার্চুয়াল স্মোক-ব্রেক সাইটে যান। তাঁরা সেখানে ধূমপান করতে যান না। সেখানে বেনামি ব্যবহারকারীদের ‘আজকের দিনটা কোনোমতে পার করছি’ কিংবা ‘বাড়ি যেতে ইচ্ছা করছে’ এমন বার্তাগুলো দেখে তিনি সান্ত্বনা পান। এখানে সরাসরি যোগাযোগের বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, তরুণেরা এখন এমন এক অনিশ্চয়তা ও বার্ন আউটের যুগে বাস করছেন, যেখানে তাঁরা দায়বদ্ধতাহীন একধরনের হালকা ডিজিটাল সংযোগ পছন্দ করেন। ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের সহানুভূতি এবং সামাজিক অনুভূতির সঙ্গে জড়িত নিউরাল সিস্টেমগুলো শারীরিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারে। মস্তিষ্ক যখন ভার্চুয়াল মানুষদের বাস্তব বলে প্রসেস করে, তখন একটি যৌথ অভিজ্ঞতার অনুভূতি তৈরি হয়, যা একাকিত্ব ও উদ্বেগ কমায়।

এটি কি কার্যকর সমাধান, নাকি ক্ষতিকর ফাঁদ

চাপের মুখে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের জন্য এই ডোপামিন সাইটগুলো বর্তমানে একটি আধুনিক ও সস্তা কোপিং মেকানিজম বা মানসিক চাপমুক্তির চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু এই ট্রেন্ডের প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ক্ষতিকর বা বাধ্যতামূলক কোনো অভ্যাসের বিকল্প হিসেবে এই সাইটগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, অবাস্তব কেনাকাটার মাধ্যমে যদি কেউ আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে তা আর্থিক ও মানসিক সুস্থতা রক্ষা করে। মনোবিজ্ঞানী ড. গ্যাব্রিয়েল শ্রেয়ার-হফম্যান এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, এই সাইটগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও মানুষের আসল সমস্যার সমাধান করছে না। তরুণেরা কেন বাস্তব জীবন থেকে পালিয়ে এই ভার্চুয়াল শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন, সেই মূল মানসিক বা সামাজিক সংকটটি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। যদি এই অবাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষের বাস্তব জীবনের অর্থপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জায়গা কেড়ে নেয়, তবে তা মানসিক বঞ্চনাবোধ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে, দ্য কোরিয়া টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত