
গরম সরিষার তেলে শুকনা মরিচ আর গোটা ধনের ফোড়ন এবং চিংড়ি দিয়ে রান্না করা অথবা সেদ্ধ করে তাতে স্রেফ পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কুচি দিয়ে ভর্তা! গরম ভাতের সঙ্গে বাঙালির এ এক দারুণ খাবার। বলছি মিষ্টিকুমড়ার কথা। কুমড়াটি তো বটেই, তার শাক আর বীজও খাওয়া যায় বহু উপায়ে সুস্বাদু করে এবং এগুলো ভীষণ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। দেশের প্রতিটি জেলায় অনায়াসে এই সবজি জন্মে বলে আমাদের কাছে এর কদর একটু কম হলেও এর রয়েছে শত শত রেসিপি। কিন্তু এর পুষ্টিগুণের কথা জানলে অবাকই হতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুড ডেটা সেন্ট্রাল ডেটাবেইসের তথ্য অনুযায়ী, এক কাপ বা ২৪৫ গ্রাম লবণ ছাড়া সেদ্ধ বা রান্না করা মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে মাত্র ৪৯ ক্যালরি। এ ছাড়া রয়েছে—
প্রোটিন: ১.৭৬ গ্রাম
আঁশ: ২.৭ গ্রাম
চর্বি: ০.১৭ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ১২ গ্রাম
কুমড়ায় শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজও থাকলেও এতে কোলেস্টেরল থাকে না। কুমড়ায় থাকা ভিটামিন ও খনিজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, রিবোফ্লোবিন, পটাশিয়াম, কপার, ম্যাংগানিজ, থায়ামিন, ভিটামিন বি৬, ফোলেট, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, নিয়াসিন, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস।
মিষ্টিকুমড়া খাদ্য আঁশ বা ফাইবারেরও ভালো উৎস। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩৮ গ্রাম আঁশজাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফাইবার রক্তে শর্করা শোষণের গতি ধীর করে। একই সঙ্গে এটি নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে এবং হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে। এক কাপ তাজা রান্না করা কুমড়ায় প্রায় ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে।
মিষ্টিকুমড়া শুধু যে বাংলাদেশে খাওয়া হয়, তা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি খাওয়ার প্রচলন আছে। এটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি হয়। সে রকম কিছু খাবারের কথা জেনে নেওয়া যাক।

কুমড়ার মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে ঝাল ও মসলার ভারসাম্য তৈরি করতে চাইলে আফগানিস্তানের চ্যালাও কাদু বেশ আকর্ষণীয়। আমাদের দেশীয় রান্নাঘরেও এটি সহজে বানিয়ে ফেলা সম্ভব। কুমড়াকে মসলার সঙ্গে ধীরে ধীরে রান্না করে নরম করা হয়। ফলে কুমড়ার মিষ্টি ভাব থাকার পাশাপাশি মসলার ঝাঁজ খাবারে ভালোভাবে মিশে যায়। এই পদ তৈরিতে প্রথমে কুমড়া টুকরা করে হালকা ভেজে নেওয়া হয়। এরপর পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনে ও মরিচের মতো মসলা দিয়ে তা রান্না করা হয়। টমেটো যোগ করলে এতে আসে হালকা টক ভাব, যা কুমড়ার মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করে। কেউ কেউ এতে গরু বা খাসির কিমাও ব্যবহার করেন, ফলে খাবারটি আরও সুস্বাদু হয়। চ্যালাও কাদুর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর সঙ্গে দইয়ের ব্যবহার। ঘন ও মসলাদার কুমড়ার ওপর টক দই দিলে স্বাদে আসে সতেজতা এবং মসলার তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। এটি ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা করতে পারেন।

ঝাল-মসলাদার তরকারির বাইরে কুমড়া দিয়ে হালকা ও মজাদার একটি পদ খেতে চাইলে ভিয়েতনামের কানহ বাই ডু থিট হতে পারে ভালো বিকল্প। এটি মূলত কুমড়া ও মাংস দিয়ে তৈরি একধরনের স্যুপ, যেখানে কুমড়ার নরম ও মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে মাংসের উমামি স্বাদ মিশে যায়। এই স্যুপ তৈরিতে কুমড়া টুকরা করে নিয়ে তার সঙ্গে কিমা করা মাংস ব্যবহার করা হয়। কিমার সঙ্গে পেঁয়াজ, গোলমরিচ ও মসলা মিশিয়ে এরপর স্টক বা পানিতে সেগুলো রান্না করে কুমড়া যোগ করা হয়। কুমড়া নরম হয়ে এলে এতে ফিশ সস ও সামান্য চিনি ব্যবহার করে স্যুপের স্বাদ আরও বাড়িয়ে নেওয়া যায়।

বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে মিয়ানমারের পামকিন কারিতে। নামেই বোঝা যায়, এটি কুমড়াকে প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি খাবার। আমাদের দেশে প্রচলিত কুমড়ার তরকারির সঙ্গে এর পার্থক্য তৈরি করে বিশেষ উপাদান; বিশেষ করে তেঁতুল। এই রান্নায় কুমড়ার সঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ও মরিচ ব্যবহার করা হয়। মসলাগুলো ভালোভাবে কষিয়ে তাতে কুমড়ার টুকরা দিয়ে রান্না করে নিন। কুমড়া নরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নিজস্ব মিষ্টি স্বাদ তরকারিতে মিশে যায়। এরপর তেঁতুলের সামান্য টক ভাব যোগ করলে তৈরি হয় মিষ্টি, ঝাল ও টক স্বাদের চমৎকার ভারসাম্য।

মিষ্টিকুমড়া দিয়ে শুধু ঝাল বা নোনতা খাবারই নয়, তৈরি করা যায় মিষ্টি পদও। ভারতের কদ্দু কা হালুয়া তার একটি চমৎকার উদাহরণ। কুমড়ার প্রাকৃতিক মিষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই হালুয়া দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও সুস্বাদু। হালুয়া তৈরির জন্য কুমড়া সাধারণত কুরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ঘি দিয়ে কুমড়া ভেজে নেওয়া হয়, যাতে এর কাঁচা গন্ধ চলে যায় এবং স্বাদ আরও গভীর হয়। পরে দুধ ও চিনি যোগ করে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। কুমড়া নরম হয়ে মিশ্রণটি ঘন হতে শুরু করলে এতে এলাচিগুঁড়া দেওয়া হয়। এলাচির সুগন্ধ কুমড়ার মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়। এরপর কাজুবাদাম, কাঠবাদাম বা পেস্তার মতো বাদাম ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়। বিকেলের নাশতা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বিশেষ দিনের মিষ্টান্ন হিসেবে এটি পরিবেশন করতে পারেন।

কুমড়া দিয়ে মিষ্টি বেকড খাবারের মধ্যে চকলেট চিপ মাফিন বেশ আকর্ষণীয়। নরম মাফিনের ভেতরে কুমড়ার মৃদু মিষ্টি স্বাদ আর চকলেট চিপের সমৃদ্ধ স্বাদ দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি করা ভিন্ন ধরনের নাশতা এটি। প্রথমে ময়দা, বেকিং পাউডার, চিনি ও দারুচিনি মিশিয়ে নিন। কুমড়ার পিউরি, ডিম ও প্রয়োজনীয় তরল উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে শুকনা উপকরণের সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। সবশেষে চকলেট চিপ মিশিয়ে ছোট ছোট মাফিনের ছাঁচে ঢেলে বেক করে ফেলুন। কুমড়ার পিউরি মাফিনকে ভেতর থেকে নরম ও আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। সকালের বা বিকেলের নাশতা কিংবা শিশুদের টিফিনে এটি দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে সহজে পাওয়া সাধারণ চকলেট চিপ বা কুচি করা চকলেট দিয়েও রেসিপিটি তৈরি করা সম্ভব।
রান্নাঘরে পরিচিত এই সবজি শুধু স্বাদ ও রঙেই খাবারে বৈচিত্র্য আনে না, এর স্বাস্থ্য উপকারিতাও ভীষণ। স্বাস্থ্য উপকারিতা পেতে সুষম খাদ্যতালিকায় কুমড়া রাখা যেতে পারে সহজ একটি পুষ্টিকর খাবার হিসেবে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্য সহায়ক
কুমড়ায় প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে। কুমড়ার এই উপাদান শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। এই ভিটামিন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কুমড়ায় থাকা ভিটামিন সি শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ই, আয়রন ও ফোলেটের মতো পুষ্টি উপাদানও শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ভালো রাখতে সহায়ক।
চোখের যত্নে
কুমড়ায় থাকা বিটা-ক্যারোটিন স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির জন্য জরুরি। কুমড়ায় থাকা লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনও চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ক্যারোটিনয়েড। ভিটামিন সি ও ই-এর মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও চোখের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
হৃদ্যন্ত্রের জন্য পুষ্টি
কুমড়ায় রয়েছে পটাশিয়াম, ভিটামিন সি ও আঁশ। এগুলো হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কুমড়ার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
ত্বকের জন্যও ভালো
কুমড়ায় থাকা বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরিতে সাহায্য করে, আর ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়।
কুমড়ায় আলফা-ক্যারোটিন, বিটা-ক্যারোটিন, লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব উপাদান শরীরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ফ্রি র্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
শরতের শেষ থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত মিষ্টিকুমড়া খাওয়ার ভালো সময়। ঋতু পরিবর্তনের এই সময় মিষ্টিকুমড়া সুস্থ রাখতে সহায়ক খাবার হতে পারে। এ সময় বাজারে এর দামও থাকে নাগালে। তাই পরিমিত মিষ্টিকুমড়া খেতে পারেন এ সময়।
সূত্র: ইটিং ওয়েল, ম্যাটাডোর নেটওয়ার্ক, হেলথলাইন, মেডিকেল নিউজ টুডে

অনেকের ধারণা, রাতে টানা ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলেই স্বাস্থ্যের যত্ন শেষ। কিন্তু আধুনিক ঘুম গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ঘুমের মোট সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা ঠিক কোন ধরনের ঘুম পাচ্ছি। বিশেষ করে ঘুমের যে সময়ে আমরা উজ্জ্বল বা বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখি, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় র্যাপিড আই...
৪ ঘণ্টা আগে
গোসল করতে পানিতে নামতে হয়, এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু গোসল যদি হয় গাছপালা আর বন জঙ্গলের মাঝে, পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ আর চারপাশে পাখির ডাক শুনতে শুনতে? জাপানে এমনই এক অভ্যাসের নাম শিনরিন-ইয়োকু বা ফরেস্ট বাথিং। এখানে পানি দিয়ে শরীর ধোয়ার কোনো বিষয় নেই; বরং বনের পরিবেশ, বাতাস, গন্ধ, শব্দ...
৭ ঘণ্টা আগে
ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডা লাগে ঠিকই। কিন্তু সকালে রোদের তাপে অতিরিক্ত ঘাম তো হচ্ছেই। সঙ্গে পুড়ে তামাটে হয়ে যাচ্ছে ত্বক। ফলে অতিরিক্ত ঘাম ও রোদের ক্ষতিকর রশ্মির প্রভাবে ত্বকের ক্ষতি কম-বেশি এ ঋতুতেও হচ্ছে। এই সময় অনেকের ত্বক নিস্তেজ, ক্লান্ত ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। শুধু রোদে পুড়ে ত্বক তামাটে বর্ণের...
৯ ঘণ্টা আগে
আমাদের আচরণ, জীবনযাত্রার পছন্দ কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাস—এগুলো আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকি। কিন্তু সম্পূর্ণটাই কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করি? এই বিষয়গুলো কিছুটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আর কিছুটা লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরের জিনের অদৃশ্য সংকেতে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো, আমাদের ব্যক্তিত্ব বা পছন্দ শুধু পরিবেশ...
১১ ঘণ্টা আগে