Ajker Patrika

চাকরি পেতে এখন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অভিজ্ঞতা

ফিচার ডেস্ক
চাকরি পেতে এখন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অভিজ্ঞতা
ছবি: ফ্রিপিক

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৮ বছর বয়সী লিলি হঠাৎ চাকরি হারান। মার্কেটিং পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ভাবছিলেন, নতুন চাকরি পেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ৬ মাসে তিনি ৫০০টির বেশি চাকরির আবেদন করেন। কোথা থেকেও ডাক আসেনি।

শেষ পর্যন্ত একজন ক্যারিয়ার কনসালট্যান্টের কাছে যান লিলি। উদ্দেশ্য ছিল সিভি ঠিক করা, কি-ওয়ার্ড বাড়ানো বা লিংকডইন প্রোফাইল উন্নত করার পরামর্শ নেওয়া। কিন্তু যে পরামর্শ তিনি পেলেন, তা ছিল অস্বস্তিকর। তাঁকে বলা হয় কলেজ পাসের সালটি মুছে ফেলতে। চাকরিজীবনের প্রথম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বাদ দিতে, সিভিতে শুধু সাম্প্রতিক ১০ বছরের কাজ রাখতে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নিজেকে তিরিশের কোঠার প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে।

লিলি উপায় না দেখে পরামর্শ মেনে নিলেন। ফলাফল এল দ্রুত। যেসব প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস কোনো সাড়া আসেনি, সেখান থেকে ফোন আসতে শুরু করল।

নীরব প্রবণতা

লিলির ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মধ্যবয়সী কর্মীরা এমন সমস্যায় পড়ছেন। এ কারণে চাকরি পেতে সিভিতে নিজের বয়স ও অভিজ্ঞতা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁরা। গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে ‘এজ ডিসক্রিমিনেশন’ বা বয়সভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। আগে যেখানে এই বৈষম্য মূলত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের ঘিরে ছিল, এখন সেটি নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ অনেক প্রতিষ্ঠানের চোখে এই বয়স থেকে কর্মী ‘বেশি অভিজ্ঞ’ হয়ে উঠছেন।

‘গোল্ডিলকস’ প্রার্থী খোঁজা

বোস্টনের ক্যারিয়ার কনসালট্যান্ট জশ বব এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করেন ‘গোল্ডিলকস জোন’ ধারণা দিয়ে। তাঁর ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কর্মী চায়, যিনি খুব বেশি নতুন নন, আবার খুব বেশি অভিজ্ঞও নন। অভিজ্ঞতা কম হলে পুনরায় প্রশিক্ষণের ঝামেলা। অভিজ্ঞতা বেশি হলে ভয়, তিনি হয়তো বেশি বেতন চাইবেন, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়তো চাইবেন না অথবা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকবেন। জশ বব জানান, ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা অনেক নিয়োগকর্তার কাছে দক্ষতার প্রমাণ নয়।

‘আমরা তো ওকে নিতে পারব না’

মিনিয়াপোলিসের মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ জেসিকা এলার্স বলেন, বড় সমস্যা হলো খরচের আশঙ্কা। নিয়োগকর্তারা যখন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ভরা একটি সিভি দেখেন, তখনই ধরে নেন এই প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে বেতন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগে আবেদন বাতিল হয়ে যায়। জেসিকার নিজের অভিজ্ঞতাও তেমনই। ৩৭ বছর বয়সে চাকরি হারানোর পর তিনি দেখেন, নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের উচ্চতর ডিগ্রি ও পুরোনো অভিজ্ঞতার অংশ সিভি থেকে বাদ দেন। শুধু ১০ বছরের কাজ রেখে আবেদন করতে শুরু করেন। তখনই চাকরির বাজারে আবার সাড়া পেতে থাকেন।

জেসিকা বলেন, ‘অবাক হওয়ার বিষয় হলো, সারা জীবনের অভিজ্ঞতা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। টিকে থাকতে হলে আমাদের কম জানি, কম পারি এমন ভান করতে হয়।’

অবাক হওয়ার বিষয় হলো, সারা জীবনের অভিজ্ঞতা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। টিকে থাকতে হলে আমাদের কম জানি, কম পারি এমন ভান করতে হয়। জেসিকা এলার্স মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ, মিনিয়াপোলিস

অভিজ্ঞতার চেয়ে মানানসই প্রার্থীর অগ্রাধিকার

এই প্রবণতা আধুনিক চাকরির বাজারের এক কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার চেয়ে খরচ কমানোই প্রতিষ্ঠানগুলো মূল লক্ষ্য। লিলি বা জেসিকার মতো কর্মীদের জন্য সিভিতে বয়স কমানো এখন একধরনের নতুন কৌশল। তাঁরা নিজেদের কম অভিজ্ঞ দেখিয়ে আবার প্রতিযোগিতায় ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যে বাজারে অভিজ্ঞতা লুকাতে হয়, সেখানে অভিজ্ঞতার মূল্য কোথায়? চাকরির কাগজে বয়স কমে গেলেও বাস্তব জীবনে অভিজ্ঞতা তো মুছে যায় না। আর দিন দিন প্রতিযোগিতার বাজার আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাই বর্তমান চাকরির বাজারে গুরুত্ব ধরে রাখতে অনেকের কাছে অভিজ্ঞতা কমানো এখন টিকে থাকার উপায়।

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত