Ajker Patrika

সাপা: এক পরাবাস্তব শহরের গল্প

হোসেন শরীফ
সাপা: এক পরাবাস্তব শহরের গল্প

উত্তর ভিয়েতনামের একটি পাহাড়ি শহর হলো সাপা। রাজধানী হো চি মিন সিটি থেকে সাড়ে তিন শ কিলোমিটার দূরে চীন সীমান্তের কাছে লাও চাই প্রদেশে তার অবস্থান। সন্ধ্যারাতে বাসে উঠলে সকালে পৌঁছানো যায়। সাপা শহর থেকে উত্তরে তাকালে যে পাহাড়শ্রেণি দেখা যায়, তার পরে চীন। একদিন সন্ধ্যায় আমি সেই শহরে যাওয়ার বাসে উঠে পড়লাম।

চমৎকার এসি বাস। উঠেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম! শেষ রাতে ঘুম ভাঙল বাসের ঝাঁকুনিতে। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি, বাইরে মেঘে ঢাকা শহর, পাইনের মাথা দেখা যাচ্ছে। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। বাস থেকে নেমে অনেকটা পথ হেঁটে আমি আমার হোস্টেলে পৌঁছে গেলাম। পথে মেঘ কেটে কেটে রাস্তা খুঁজে এসেছি। আমার হোস্টেলের নাম গ্রিন সাপা হোস্টেল। পাহাড়ের ঢালে চীনমুখী কাঠের দোতলা বাড়ি। নিচতলায় রেস্টুরেন্ট আর ওপরে থাকার ঘর। সবই কাঠ দিয়ে বানানো—মেঝে, ছাউনি, সিঁড়ি, পিলার। মোটা মোটা গাছের লগ। এই অঞ্চলে কাঠ সহজলভ্য।

লম্বা টানা বারান্দা থেকে হ্যাম রং পাহাড়শ্রেণি পর্যন্ত দেখা যায়। সবুজ পাহাড়ের ওপর মেঘের ওড়াউড়ি। কিছুক্ষণ বাদেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। আমি একটা মোটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে মেঘ, পাহাড়, বৃষ্টি আর পাইনের খেলা দেখছি নিবিষ্ট হয়ে। পাহাড়ের ঢালে দিগন্তবিস্তৃত লুকানো জনপদ। পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ধাপযুক্ত ধানখেত। আর পাহাড়ের আড়ালে তাদের আবাস। আকারে খর্বাকৃতির, পরিষ্কার উজ্জ্বল ত্বক, মাথায় হালকা সোনালি চুল। নারীদের কোমর এক টুকরা রঙিন কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকে। প্রায় সব নারীরই একটা করে দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো।

দুই-তিন দিন হয়ে গেল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিরস চা পান করি, মেঘ দেখি। আমার জমে থাকা গ্লানি সাদা পাতলা মেঘের সঙ্গে উবে যাচ্ছে। বাড়িটিতে দুটি বিড়াল আর একটি কুকুর এবং ফুটফুটে একটি শিশু আছে। আমি হ্যামকে শুয়ে শুয়ে দোল খাই। শিশু আর কুকুরের খুনসুটি দেখি।

একদিন দুপুরবেলা এক ভিয়েতনামি ছেলের সঙ্গে ক্যাট ক্যাট ভিলেজ দেখতে গেলাম। প্রথমে স্কুটার, তারপর কয়েক শ সিঁড়ি বেয়ে এক রূপকথার গ্রামে এসে আমি হাজির হলাম। একটা কাঠের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে দেখলাম, সামনে দানবের মতো একটা ঝরনা গর্জন করে জলপাত করছে। নিচে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। দুই পাশে পাহাড়ের চূড়া, তার ওপরে মেঘ। পাহাড়ের পাথুরে গায়ে অর্কিড ঝুলছে; যেন কোনো শ্যামলা নারী ঝুমকা পরে সেজেগুজে বসে আছে। একটা প্রাচীন টারবাইন ঘুরছে নদীর ওপরে। পাশ দিয়ে কাঠের লম্বা রাস্তা। জায়গাটা আর্দ্র ও শীতল। আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, আর অনুভব করছি, কয়েক শ বছর আগে ফরাসিরা পাহাড়ের আড়ালে এই গ্রামটা যখন আবিষ্কার করে, তাদের কী মনে হয়েছিল! গ্রামটি তাদের নিশ্চয় পছন্দ হয়েছিল। তাই এখানে তারা রাস্তা, ব্রিজ, টারবাইন ইত্যাদি তৈরি করে নিজেদের বসবাসের জন্য। বহু বছর হলো, ফরাসিরা চলে গেছে ভিয়েতনাম ছেড়ে। কিন্তু ভিয়েতনামের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাত্রায় তারা বড় প্রভাব রেখে গেছে।

733414797_871045566074149_8487514115397161242_n

গ্রামটি পরাবাস্তব লাগছে আমার কাছে। বৃষ্টি শুরু হলো। আমিসহ অন্যরা পাহাড়ের সঙ্গে লাগোয়া কিছু কুঠিরে আশ্রয় নিলাম। কয়েকজন নারী সেখানে কাজ করছেন—বুননের কাজ। কেউ রান্না করছেন। তাঁদের জামাকাপড় খুব ব্যতিক্রম। গয়নাগুলো আগে আমি দেখিনি। একজন আমার দিকে চা বাড়িয়ে দিলেন। চা-পাতার চা নয়। শুকনো ফুলের পাপড়ি এবং শিকড় গরম পানিতে ভিজিয়ে দিয়েছে। মহিষের মাংসের বড় বড় টুকরা মসলা মাখিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে কেটে আমার হাতে এক টুকরা ধরিয়ে দিল কেউ। আমি কিছুক্ষণ চিবিয়ে গিলে নিলাম।

আমার ভিয়েতনামি বন্ধুটি ইংরেজি জানে না। আমি ভিয়েতনামের ভাষা জানি না। কথা না বলা যাক, তারপরেও আমরা বন্ধু। আমি স্কুটির পেছনে বসে থাকি। সে চালায়। কোথাও চমৎকার জায়গার দেখা পেলেই দাঁড়িয়ে যাই। এখানে পাহাড়ের আড়ালে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক আসে আর যায়, যায় আর আসে। এর দুই দিন পরে এক মং দম্পতির সঙ্গে পাহাড়ের আড়ালে ট্রেকিংয়ে যাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলাম। তাঁরা আমাকে তাঁদের গ্রামে নিয়ে যাবেন। সাপার বিখ্যাত ধাপযুক্ত ধানখেত দেখাবে। এই জন্য তাঁদের আমি দুই হাজার টাকার মতো দেব।

WhatsApp-Image-2026-07-01-at-4.34

শহর পেরিয়ে আমরা ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছি। কখনো পাহাড়ি নদী, কখনো বন পেরিয়ে যাচ্ছি। ভীষণ পিচ্ছিল পথ। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। অনেকক্ষণ থেকে আমি একাই হাঁটছিলাম। সঙ্গে আমার গাইড। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার, আমি একা কেন?’ তিনি জানালেন, আজ কোনো ট্যুরিস্ট রাজি হয়নি তাঁর সঙ্গে ট্রেক করার জন্য। বলে একটা হাসি দিল। গাইড ছেলেটি আমার বয়সী হবে। একবার আমার জাতীয়তা জানতে চাইলেন। জানাতেই তিনি বললেন, বাংলাদেশের নাম এর আগে শোনেনি! আমি মোবাইল ফোন বের করে ম্যাপ থেকে আমাদের দেশ দেখালাম। বললাম, ‘এখান থেকে সোজা পশ্চিম দিকে হেঁটে যেতে থাকলে একসময় আপনি আমার দেশে পৌঁছে যাবেন। এবার তিনি আমাদের মুদ্রা দেখতে চাইলেন। আমি পাসপোর্ট আর গোলাপি দশ টাকার নোট বের করে দেখালাম।

পাহাড়ি নদীর পাড়ে এসে আমি এক ভ্যালিতে থমকে দাঁড়ালাম। খাঁজ কাটা পাহাড়ের ধাপে ধাপে সবুজ ধানখেত। সরু আইল। কী অপূর্ব! এভাবে মিশে গেছে হাম রং পাহাড়শ্রেণি পেরিয়ে চীন দেশে। পথে এক পাহাড়ি বাজার থেকে আলুবোখারা আর কলা কিনে নিলাম। আলু বোখারাগুলো ভীষণ মিষ্টি। তার আগে আমি কখনোই কাঁচা আলুবোখারা খাইনি। হেঁটে হেঁটে বিকেল কাছে এসে দাঁড়াল আমার। পাহাড়ের চূড়ার ওপর সূর্যের আলো হলুদ দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সবুজ ধানখেতের ওপরে হলুদ আলোয় ভরে গেল উপত্যকা। আমার পা ব্যথা করছে, কিন্তু প্রাণ তখনো চঞ্চল।

সাপার মতো এত আধুনিক শহরে আমি কখনো যাইনি। এই শহরের মাঝখানে মুক্ত অডিটরিয়াম। সন্ধ্যায় এখনে ফ্রি স্টাইলে নাচ, গান হয়। সবাই খাবার খায়, পান করে। আর উপভোগ করে। শহরে এক পাশে আরেকটা লেক। চারপাশে জগিং ট্র‍্যাক, টেনিস খেলার কোট। আমি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাপাকে অবগাহন করি। মেঘ, বৃষ্টি, রোদ, পাইনের মাথা এবং চীন সীমান্ত আমাকে খুব কৌতূহলী করে তোলে। আমি নিঝুম রাতে সাপার পাহাড়ি রাস্তা ধরে হেঁটে যাই। পাহাড়ের কার্নিশে দাঁড়িয়ে চীন সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকি। চীন আমার কাছে রহস্যময় এক দেশ! আর এদিকে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সাপা উপত্যকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত