Ajker Patrika

মন কেন সব সময় শর্করা খেতে চায়

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
মন কেন সব সময় শর্করা খেতে চায়
শর্করা মূলত মস্তিষ্কের ফুয়েল। শর্করা থেকে আসা গ্লুকোজ না পেলে ব্রেন ঠিকঠাক কাজই করতে পারে না, মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। ছবি: পেক্সেলস

বলা হয় ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। মাছটা প্রোটিন আর ভাতটা হলো শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। মাছ না পেলেও লবণ দিয়ে অনেকে ভাত খেয়ে নিতে পারবেন অনেকটাই। অনেকের রাতে ঘুমই আসতে চায় না পেটে ভাত না পড়লে। তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছে ভাতের জায়গা ছিনিয়ে নিয়েছে পিৎজা কিংবা নুডলসের মতো খাবারগুলো। ঘুরেফিরে সেই শর্করা। পিৎজার শেষ স্লাইসটায় কামড় বসানোর আগে বা গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা দেখে কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, ‘মনটা কেন সব সময় এমন কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা খাওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করে?’ উত্তরটা একদম সোজা। দোষ আপনার নয়, বিজ্ঞান বলছে, দোষ আসলে আপনার ডিএনএর।

বিজ্ঞান যা বলে

ভাত আর রুটি ছাড়াও গাজর, শসা, শাকসবজি এমনকি নানা জাতের ডালও কিন্তু কার্বোহাইড্রেটের দারুণ উৎস, যেগুলোতে প্রচুর আঁশ থাকে। ছবি: পেক্সেলস
ভাত আর রুটি ছাড়াও গাজর, শসা, শাকসবজি এমনকি নানা জাতের ডালও কিন্তু কার্বোহাইড্রেটের দারুণ উৎস, যেগুলোতে প্রচুর আঁশ থাকে। ছবি: পেক্সেলস

আমরা অনেকে ভাবি, শর্করার প্রতি মানুষের এই আদিখ্যেতা হয়তো হাল আমলের পিৎজা-বার্গারের জমানায় শুরু হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা। মানুষের শরীরে এএমওয়াই ওয়ান নামের একটি জিন রয়েছে, যা কার্বোহাইড্রেট হজম করার এনজাইম তৈরি করে। আর এই জিনের জন্ম মানবজাতির উৎপত্তিরও শত শত হাজার বছর আগে। আদিম গুহাবাসীরা হয়তো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেত না, কিন্তু শিকড়জাতীয় সবজি পুড়িয়ে খেতে তারা ভালোবাসত বলে জানা যায়। অর্থাৎ, কার্বোহাইড্রেটের প্রতি এই প্রেম আমাদের রক্তে আর ডিএনএতে একদম গেঁথে আছে। কিন্তু শর্করা নিয়ে তো সমাজে বদনামের শেষ নেই। ‘শর্করা খেলেই মোটা হবেন’ কিংবা ‘শর্করা মানেই ক্ষতিকর’—এমন নানা কথা চারদিকে ঘুরছে। অথচ সত্যটা হলো, সব শর্করা কিন্তু এক নয়।

সব শর্করা দোষী নয়

প্রধানত শর্করা দুই প্রকার। এক হলো সিম্পল শর্করা বা সহজ শর্করা, যেমন মিষ্টি, সোডা, সাদা পাউরুটি বা ফল। এগুলো দ্রুত হজম হয়ে শরীরে ঝটপট শক্তি দেয়। তবে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়িয়ে আবার কমিয়েও দেয়। অন্যটি হলো কমপ্লেক্স শর্করা বা জটিল শর্করা। এগুলোর মধ্যে আছে লাল চালের ভাত, হোল গ্রেইন পাউরুটি, ওটস, ডাল, শাকসবজি ইত্যাদি। এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয়ে শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তির জোগান দেয় এবং পেট ভরিয়ে রাখে।

শর্করা আমাদের এত প্রিয় কেন

কার্বোহাইড্রেট খেলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামে একপ্রকার ফিল গুড হরমোন নিঃসৃত হয়। ফলে মানসিকভাবে আমরা খুশি থাকি। ছবি: পেক্সেলস
কার্বোহাইড্রেট খেলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামে একপ্রকার ফিল গুড হরমোন নিঃসৃত হয়। ফলে মানসিকভাবে আমরা খুশি থাকি। ছবি: পেক্সেলস

শর্করা মূলত মস্তিষ্কের ফুয়েল। অর্থাৎ আপনার ব্রেন সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে কার্বোহাইড্রেট। শর্করা থেকে আসা গ্লুকোজ না পেলে ব্রেন ঠিকঠাক কাজই করতে পারে না, মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। আমাদের শরীরের হ্যাপিনেস হরমোনও শর্করা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। কার্বোহাইড্রেট খেলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামে একপ্রকার ফিল গুড হরমোন নিঃসৃত হয়। সহজ কথায়, শর্করা আপনাকে মানসিকভাবে খুশি রাখে। খেয়াল করে দেখবেন, অনেক মানুষের মন খারাপ থাকলে তাঁরা প্রচুর খাবার খেতে শুরু করেন। সেসব খাবারের বেশির ভাগই শর্করা জাতীয়। মন খারাপের সময় এজাতীয় খাবার খেয়ে অনেকে মানসিক শান্তি অনুভব করেন। শরীরচর্চার জন্য বা সারা দিন দৌড়াদৌড়ি করার মূল জ্বালানি জোগায় শর্করা। এমনকি এর আঁশ হজম প্রক্রিয়া ও অন্ত্র ভালো রাখে।

মজার ৩ ভুল ধারণা

  • শর্করা মানেই শুধু ভাত আর রুটি, এই ধারণা একদম ভুল। গাজর, শসা, শাকসবজি এমনকি নানা জাতের ডালও কিন্তু কার্বোহাইড্রেটের দারুণ উৎস, যেগুলোতে প্রচুর আঁশ থাকে।
  • অনেকে বলেন, রাতে শর্করা খেলে ওজন বাড়ে। কিন্তু তথ্য বলছে, সময় কোনো বিষয় নয়। আপনি দিনে বা রাতে কখন শর্করা খাচ্ছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি পুরো দিনে মোট কতটা ক্যালরি এবং কোন ধরনের শর্করা খাচ্ছেন।
  • শর্করা খেলে নাকি ঝিমুনি আসে। অথচ অতিরিক্ত যেকোনো খাবার খেলেই অলস লাগে। দোষটা কার্বোহাইড্রেটের একা নয়, বরং অতিরিক্ত প্রোটিন বা লবণ খেলেও ক্লান্তি আসতে পারে।

তাহলে কি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শর্করা খাওয়া যাবে? উত্তর হলো, একদমই না। প্রক্রিয়াজাত রিফাইনড শর্করা, যেমন সাদা পাউরুটি বা চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো। তবে হোল গ্রেইন, ফল ও সবজিজাতীয় রিফাইনড ছাড়া স্বাস্থ্যকর শর্করা খাওয়ার ক্ষেত্রে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই পরেরবার যখন শর্করা খাওয়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করবে, খুব বেশি অপরাধবোধে না ভুগে পরিমাণমতো সঠিক ও স্বাস্থ্যকর শর্করা বেছে নিতে ভুলবেন না। আপনার শরীর ও মন—উভয়ই আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।

সূত্র: ওয়েব মেড, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত