Ajker Patrika

কোরিয়ার নিরামিষ খাবার: স্বাদে সংযম, পরিবেশনায় সরলতা

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
কোরিয়ার নিরামিষ খাবার: স্বাদে সংযম, পরিবেশনায় সরলতা
দক্ষিণ কোরিয়ারতেও রয়েছে নিরামিষ খাবারের ঐতিহ্য। ছবি: সংগৃহীত

কোরীয় খাবার বলতে সাধারণভাবে আমাদের মনে ভেসে ওঠে ঝাল স্টু, কিমচি কিংবা তীব্র স্বাদের নানা পদ। কিন্তু দেশটির খাদ্যসংস্কৃতির আরেকটি ধারা ঠিক এর বিপরীত— শান্ত, সংযত ও প্রকৃতিনির্ভর। টেম্পল ফুড বা কোরীয় মন্দিরের খাবার শুধু নিরামিষ একটি ধরন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৌদ্ধ দর্শন, ধ্যান, ঋতু এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এখানে খাবার তৈরি ও খাওয়ার প্রক্রিয়াটিকেও একধরনের সচেতন অনুশীলন হিসেবে দেখা হয়।

খাবার যখন ধ্যানের অংশ

দক্ষিণ কোরিয়ার পাহাড়ি মন্দিরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এই খাবারের চর্চা হয়ে আসছে। খাবার তৈরির প্রতিটি ধাপ, অর্থাৎ উপকরণ ধোয়া, ভেজানো, সেদ্ধ করা কিংবা ধীরে রান্না—এ সবই সচেতনতার সঙ্গে করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের খাবারের উদ্দেশ্য ইন্দ্রিয় উত্তেজিত করা নয়, শরীর ও মনকে শান্ত রাখা। এই দর্শনে ঋতুভেদে পাওয়া তাজা উপকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাহাড়ি শাকপাতা, বুনো গাছের কচি ডগা, শিকড়, মাশরুম, সয়াবিন, সামুদ্রিক শৈবাল ও তিলের মতো উপকরণ নিয়মিত ব্যবহার করা হয় এসব খাবারে।

পাঁচ ঝাঁজাল সবজি নেই

রসুন, পেঁয়াজ, চিভস, লিক ও পেঁয়াজ কলি এই পাঁচটি ঝাল খাবার কোরিয়ার মন্দিরের খাবারে নিষিদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত
রসুন, পেঁয়াজ, চিভস, লিক ও পেঁয়াজ কলি এই পাঁচটি ঝাল খাবার কোরিয়ার মন্দিরের খাবারে নিষিদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

কোরীয় মন্দিরের খাবারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পাঁচ ধরনের ঝাঁজাল সবজি এড়িয়ে চলা। এগুলো হলো রসুন, পেঁয়াজ, চিভস, লিক ও পেঁয়াজ কলি। কোরীয় বৌদ্ধ দর্শনে মনে করা হয়, এসব উপকরণ মনের উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং ধ্যানের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবে এসব উপকরণ বাদ গেলেই যে খাবার বিস্বাদ হয়ে যাবে, তেমন নয়। বরং মন্দিরের খাবারের স্বাদ তৈরিতে গুরুত্ব পায় ফারমেন্টেশন, প্রাকৃতিক উপকরণ।

টোফুতে খোঁজা হয় স্বাভাবিক স্বাদ

মন্দিরের খাবারে সয়াবিনের তৈরি টোফুর ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টোফুকে কখনো স্বচ্ছ ঝোলে ধীরে রান্না করা হয়, কখনো হালকা ভেজে পুরোনো সয়া সসের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। আবার তিলের তেল ও পাহাড়ি শাকের সঙ্গেও এটি মেশানো হয়। মন্দিরের খাবারে টোফু মাংসের বিকল্প নয়। বরং নিজস্ব স্বাদ ও গঠনসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ উপকরণ হিসেবে একে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নরম টোফুর সঙ্গে খানিক শক্ত বা সহজে চিবানো যায় এমন শাক, মাশরুম বা পদ্ম মূলের মতো উপকরণের সমন্বয়ে খাবারে তৈরি হয় নানা ধরনের টেক্সচার।

ফারমেন্টেশনে তৈরি হয় গভীর স্বাদ

কোরিয়ার মন্দিরের খাবারে ফারমেন্টেশন বা গাঁজনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দোয়েনজাং, গাঞ্জাং এবং বিভিন্ন মন্দিরের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি গোচুজাংয়ের মতো উপকরণ দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা হয়। সময়ের সঙ্গে এগুলোতে তৈরি হয় গভীর উমামি স্বাদ, যা অতিরিক্ত মসলা ছাড়াই খাবার সমৃদ্ধ করে। ফারমেন্টেড বা গাঁজানো খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি শুকিয়ে, ভাপে, সেদ্ধ করে কিংবা অল্প তেলে ভেজে খাওয়া হয়।

কোরিয়ার দোয়েনজাং, গাঞ্জাংসহ বিভিন্ন মন্দিরের রয়েছে নিজস্ব গাঁজন পদ্ধতি। ছবি: সংগৃহীত
কোরিয়ার দোয়েনজাং, গাঞ্জাংসহ বিভিন্ন মন্দিরের রয়েছে নিজস্ব গাঁজন পদ্ধতি। ছবি: সংগৃহীত

সরলতা মানেই একঘেয়েমি নয়

মন্দিরের খাবারে ঝাল-মসলার আধিক্য না থাকলেও স্বাদের বৈচিত্র্য কম নয়। মিষ্টি, টক, নোনতা, তিতা ও উমামি—একই খাবারে এমন বিভিন্ন স্বাদ ধীরে ধীরে অনুভূত হয়। খাবারের স্বাদের পাশাপাশি এর গঠন বা টেক্সচারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। টোফু, মাশরুম ও পেরিলা পাতা দিয়ে তৈরি মান্দু, নানা সবজি ও ভাতের বিবিমবাপ কিংবা ফারমেন্টেড উপকরণে তৈরি বিভিন্ন পদ এ ধরনের খাবারের বৈচিত্র্য তুলে ধরে।

মন্দিরের বাগান থেকে সরাসরি খাবারের টেবিলে, অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এই খাদ্যসংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোরিয়ার দক্ষিণ জেওলা প্রদেশের বেকইয়াংসা মন্দিরের সন্ন্যাসিনীরা মন্দিরের বাগানে পেরিলা পাতা, মুলা ও অন্যান্য ফসল চাষ করেন। অর্থাৎ উপকরণ উৎপাদন থেকে রান্না পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। এই ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করেছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী জিয়ং কোয়ান। ‘সেফ’স টেবল’-এ তাঁর রান্না ও খাবারের দর্শন তুলে ধরার পর কোরীয় টেম্পল ফুড বিশ্বজুড়ে আরও পরিচিতি পায়।

সূত্র: টফু ওয়ার্ল্ড

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত