Ajker Patrika

বেলুচি দমপুখত মাটন: বাষ্পে সেদ্ধ হওয়া শতাব্দীপ্রাচীন এক ঐতিহ্য

ফিচার ডেস্ক
বেলুচি দমপুখত মাটন: বাষ্পে সেদ্ধ হওয়া শতাব্দীপ্রাচীন এক ঐতিহ্য
সূত্র: পাকিস্তান ডট রেসিপিস

বিরিয়ানি রান্নার ক্ষেত্রে আমরা দমপুখত শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু খাসির মাংসের দমপুখত! হ্যাঁ, সেই খাবারও আছে। বেলুচিস্তানের রন্ধন ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি দমপুখত মাটন। ‘দমপুখত’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ‘দম’ অর্থ বাষ্প বা নিশ্বাস এবং ‘পুখত’ অর্থ রান্না করা। অর্থাৎ, এটি এমন একটি রান্না, যা নিজের বাষ্পেই ধীরে ধীরে সেদ্ধ হয়। এই পদ্ধতিতে মাংসে কোনো অতিরিক্ত পানি যোগ করা হয় না; বরং মাংসের নিজস্ব রস, চর্বি ও সুগন্ধি উপকরণ থেকে বের হওয়া আর্দ্রতাই রান্নার কাজ সম্পন্ন করে।

খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, এই কৌশল মোগল যুগেরও বহু আগের। বেলুচিস্তানের যাযাবর জনগোষ্ঠী সীমিত পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে মাংস রান্নার জন্য এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। শক্তভাবে সিল করা পাত্রের ভেতরে তাপ ও আর্দ্রতা আটকে থাকায় মাংস এতটাই কোমল হয়ে ওঠে যে হাড় থেকে প্রায় নিজে থেকে আলাদা হয়ে আসে। এই রান্নার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৌশল নয়, ধৈর্য। একবার পাত্র সিল করে দিলে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সেটি খোলা যায় না।

উপকরণ

খাসির রানের বড় টুকরা বা কাঁধের মাংস দেড় কেজি, ভেড়ার লেজের চর্বি বা দেশি ঘি ৪ টেবিল চামচ, মোটা করে কাটা বড় পেঁয়াজ ২টি, ২ ইঞ্চি মোটা স্লাইস করা তাজা আদা, আস্ত রসুন কোয়া ৬টি, লবণ স্বাদমতো, গোটা গোলমরিচ ২ চা-চামচ, সামান্য ভাঙা বড় এলাচি ৩টি, তেজপাতা ৩টি, পাত্রের মুখ সিল করার জন্য আটা প্রায় দেড় কাপ, কুচি ধনেপাতা এবং ফালি করা লেবু ৩টি।

প্রস্তুত প্রণালি

মাংস মেরিনেট করুন

মাংসে লবণ ও গোটা গোলমরিচ মাখিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট রেখে দিন। সময় থাকলে ২ ঘণ্টা ফ্রিজে রাখলে আরও ভালো। এই ধাপেই মাংসের ভেতর পর্যন্ত স্বাদ পৌঁছে যায়।

পাত্রে উপকরণ সাজান

ভারী তলার একটি পাত্র বা মাটির হাঁড়িতে প্রথমে ঘি বা দুম্বার চর্বি দিন। এরপর পেঁয়াজ, আদা, রসুন, তেজপাতা ও বড় এলাচি বিছিয়ে দিন। সবশেষে মেরিনেট করা মাংসের টুকরাগুলো ওপর থেকে সাজিয়ে রাখুন। কোনো অবস্থাতেই পানি বা অন্য কোনো তরল যোগ করবেন না।

পাত্র সম্পূর্ণ সিল করুন

আটা ও অল্প পানি দিয়ে শক্ত মণ্ড তৈরি করুন। সেই মণ্ড লম্বা করে গড়িয়ে পাত্রের চারপাশে লাগিয়ে ঢাকনা শক্তভাবে আটকে দিন, যাতে ভেতরের বাষ্প বাইরে বের হতে না পারে। দমপুখতের আসল রহস্যই হলো এই বায়ুরোধী সিল।

অতি কম আঁচে দীর্ঘ সময় রান্না

সিল করা পাত্রটি সবচেয়ে কম আঁচে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা রান্না করুন। চাইলে চুলা ও পাত্রের মাঝখানে একটি তাওয়া বসিয়ে দিলে তাপ আরও মৃদু ও সমানভাবে ছড়াবে। ওভেন ব্যবহার করলে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বা ৩০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে একই সময় রান্না করা যায়।

মনে রাখবেন, রান্নার পুরো সময় পাত্রের ঢাকনা খোলা যাবে না।

মাংস পরীক্ষা করুন

চার ঘণ্টা পর আটার সিলের একটি ছোট অংশ আলতো করে সরিয়ে একটি ছুরি ঢুকিয়ে দেখুন। ছুরি যদি কোনো বাধা ছাড়াই মাংসে ঢুকে যায়, তবে রান্না শেষ। যদি মাংস তখনো শক্ত থাকে, তাহলে নতুন করে আটা দিয়ে আবার সিল করে আরও ৬০ থেকে ৯০ মিনিট রান্না করুন।

পরিবেশন

ঐতিহ্যগতভাবে অতিথিদের সামনে পাত্রের সিল ভেঙে ঢাকনা খোলা হয়। ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে সুগন্ধ বেরিয়ে আসে, সেটিই এই পদের অন্যতম আকর্ষণ। প্রয়োজনে লবণ সামান্য ঠিক করে নিন। ওপরে কুচি করা ধনেপাতা ছড়িয়ে লেবুর ফালি দিয়ে গরম-গরম পরিবেশন করুন।

টিপস

  • দমপুখতের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো পানি ব্যবহার না করা। মাংসের নিজস্ব রসই রান্নার জন্য যথেষ্ট।
  • হাড়সহ বড় টুকরার খাসির মাংস ব্যবহার করলে স্বাদ ও কোমলতা—দুটোই বাড়ে।
  • পাত্র যত ভালোভাবে সিল করা যাবে, রান্নার ফল তত নিখুঁত হবে।
  • এই পদ নানরুটি, তন্দুরি রুটি কিংবা ভাত—সবকিছুর সঙ্গেই দারুণ মানিয়ে যায়।
  • ধীর আঁচে রান্না এই রেসিপির প্রাণ। আঁচ বাড়িয়ে সময় কমানোর চেষ্টা করলে আসল বেলুচি স্বাদ পাওয়া যাবে না।

সূত্র: পাকিস্তান ডট রেসিপিস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত