Ajker Patrika

গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারলেও স্বাদে কেন ব্যর্থ হলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ১৮
গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারলেও স্বাদে কেন ব্যর্থ হলো
কলকাতার একটি বাজারে পদ্মার ইলিশ হাতে একজন মাছ বিক্রেতা। ছবি: এএফপি

স্থানীয় বাজার থেকে দুটি ৮০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ (প্রতিটি ১,২০০ টাকা দরে) কিনেছিলেন নারায়ণ চন্দ্র। চলতি মৌসুমে এটাই ছিল তাঁর প্রথম ইলিশ কেনা। রাতে পাতে প্রিয় মাছটির স্বাদের কথা মনে মনে কল্পনাও করছিলেন তিনি।

কিন্তু গরম সরিষার তেলে কেটে রাখা টুকরোগুলো ছাড়তেই সেগুলো ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেতে শুরু করে। দৃশ্যটি দেখে অবাক হয়ে যান নারায়ণ চন্দ্র। বাংলাদেশের বিখ্যাত পদ্মার ইলিশকে এভাবে তেলের মধ্যে গুঁড়ো হয়ে যেতে তিনি আগে কখনো দেখেননি।

ঢাকা থেকে টেলিফোনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে নারায়ণ চন্দ্র বলেন, ‘ওটা কি গুজরাটের ইলিশ ছিল নাকি পুরোনো বাসি মাছ? বাংলাদেশের ইলিশের মতো স্বাদ তো পাইনি, আমার রাতের খাবারটাই নষ্ট হয়ে গেছে।’

তাঁর এই সংশয় কিন্তু মোটেও অমূলক ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গুজরাটের নর্মদা অঞ্চল থেকে টন টন ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তা আসল ‘পদ্মার ইলিশ’ নামে বাজারে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ সরকার, যার আওতায় আমদানিকারকদের ইস্যু করা ১০৩টি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাতিল করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ৫৫৩ টন ভারতীয় ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

ঢাকার এক মাছ ব্যবসায়ী দ্য প্রিন্টকে বলেন, ‘বিক্রেতারা গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছিল যে, এগুলো সব পদ্মার ইলিশ, আর তাতেই সাধারণ মানুষ প্রলোভনে পড়ে গুজরাটের ইলিশ কিনতে শুরু করে।’

নারায়ণ চন্দ্রের মতো অনেকেই ব্যবসায়ীদের এই ফাঁদে পড়ে যান।

ওই মাছ ব্যবসায়ী দ্য প্রিন্টকে আরও বলেন, ‘গুজরাটের এই ইলিশ দামে কিছুটা সস্তা এবং আকারে বেশ বড় হলেও, স্বাদের দিক থেকে আমাদের দেশীয় ইলিশের ধারে কাছেও নেই।’

চাঁদপুরের বাসিন্দা আলমগীর পাটোয়ারি কয়েক দিন আগে বাজারে ইলিশ কিনতে গিয়েছিলেন। বিক্রেতা যখন দাবি করেন যে, এটি খাঁটি দেশি ইলিশ, তখন মাছের গড়ন দেখেই পার্থক্য বুঝে ফেলেন তিনি।

আলমগীর পাটোয়ারি বলেন, গুজরাটের ইলিশ দেখতে অনেকটা সাগরের মাছের মতো দেখায়। দেশি ইলিশের সেই পরিচিত মিষ্টতা ও স্বাদ এই মাছে একদমই নেই।

এদিকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি বন্ধ করলেও বাংলাদেশ মেরিন ফিশারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএফএ) দাবি, অবৈধ চোরাই পথে এখনো বাজারে ঢুকছে গুজরাটের ইলিশ।

বিএমএফএ-র সাধারণ সম্পাদক শেখ আবিদ হোসেন বলেন, গত বুধবারই সুন্দরবন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় ৭৫ টন ইলিশ দেশের বিভিন্ন বাজারে এসে ঢুকেছে। এরপর শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকায় মাছ কিনতে গিয়ে আবিদ হোসেন নিজেও বাজারে গুজরাটের এই ইলিশ দেখতে পান।

আবিদ হোসেন বলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রথম দেখাতে হয়তো পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘদিন এই খাতের সঙ্গে যুক্ত, তারা দেখলেই আসল-নকল ধরে ফেলতে পারি।’

ঠিক কবে থেকে বাংলাদেশের বাজারে গুজরাটের ইলিশ সরবরাহ হওয়া শুরু করেছিল তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে না পারলেও ঢাকার ওই মৎস্য বিক্রেতা জানান, রাজধানীর একাধিক বড় বাজারে এখন এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ভারতের গুজরাটের ইলিশ বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ ক্রেতারা এত দিন ধরে কী কিনছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় প্রকাশ করছেন। নারায়ণ চন্দ্রও অবশেষে বুঝতে পেরেছেন তাঁর কেনা ইলিশের স্বাদ কেন আলাদা লেগেছিল।

ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণ চন্দ্র বলেন, ‘এই মাছ দিয়ে কোনো অবস্থাতেই সুস্বাদু ইলিশের ঝোল রান্না করা যাচ্ছিল না।’ শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাঁর পরিবার সেই মাছ দিয়ে ইলিশ ভর্তা বানিয়ে খেয়েছেন।

ইলিশের এই নিম্নমানের কারণে হতাশ তিনি। প্রায় দুই বছর আগের স্মৃতি স্মরণ করে নারায়ণ চন্দ্র বলেন, একবার চাঁদপুরের আড়ত থেকে কয়েক কেজি পদ্মার ইলিশ কিনেছিলেন। তখন এক কেজির একটি চাঁদপুরী ইলিশের দাম পড়েছিল প্রায় ২,০০০ টাকা।

নারায়ণ চন্দ্র স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই ইলিশ ভাজার জন্য বাড়তি কোনো তেলও দেওয়া লাগত না। গরম কড়াইয়ে ভাজা শুরু হলেই তার সুবাসে পুরো এলাকা টের পেত যে, কারও ঘরে ইলিশ রান্না হচ্ছে। কিন্তু নর্মদার এই গুজরাটি ইলিশ নারায়ণ চন্দ্রের মতো ভোজনরসিকদের পাতে সেই স্বাদ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত