Ajker Patrika

৮২ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণে দু লং

ফিচার ডেস্ক
৮২ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণে দু লং
ছবি: সংগৃহীত

৮২ বছর বয়সে অনেকে ঘরকুনো জীবন বেছে নেন। কিন্তু এই বয়সে দু লং চারটি মহাদেশ ভ্রমণ করে ফেলেছেন, পা রেখেছেন ১০টির বেশি দেশে। চীনের হুবেই প্রদেশের আনলু শহরে জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন আফ্রিকা সফর শেষে ফিরলেন তিনি। মাথায় বেসবল ক্যাপ, গায়ে লাল জ্যাকেট আর লাল স্কার্ফ। চোখে-মুখে ক্লান্তি নেই, আছে নতুন অভিযানের ঝলক!

স্বপ্ন ছিল শৈশব থেকে

দু লং তাই উচ্চবিদ্যালয়ের সাহিত্য শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন একই পেশায় যুক্ত। দুই সন্তান ব্যবসায় সফল। স্থিতিশীল পরিবার, সম্মানজনক পেশা—সবই ছিল। তবু শৈশব থেকে তাঁর মনে ছিল বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবে তা শুরু হয় ৭২ বছর বয়সে, ২০১৫ সাল থেকে। এই বছরের ৩০ ডিসেম্বর দিনটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি একা প্রথমবারের মতো গুয়াংঝু থেকে সিডনি যান। তার আগে তাঁর ভ্রমণ সীমাবদ্ধ ছিল নিজ প্রদেশের মাত্র কয়েকটি শহরে।

প্রথম যাত্রার কঠিন বাস্তবতা

প্রস্তুতির জন্য তিনি প্রতিবেশীর সহায়তায় এক মাস ধরে পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত না হওয়ায় হোটেল ও ফ্লাইট বুকিং অ্যাপ ব্যবহার শেখেন, ভ্রমণসূচি প্রিন্ট করেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল কঠিন। রাতের সিডনিতে নেমে ট্যাক্সিচালককে হোটেলের ঠিকানা দিলেও চালক পথ চিনতে না পেরে ঘুরপাক খান। এতে ভাড়া বেড়ে যায়। হোটেলে পৌঁছে ভাষাজনিত সমস্যায় রিসেপশনিস্টের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি হয়। রাত ১১টায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় বেরিয়ে দেখেন, চারপাশ ফাঁকা। উদ্বেগে সেই রাত প্রায় জেগেই কাটে। পরদিন এক আফগান ব্যক্তি তাঁকে সাহায্য করেন। রেলস্টেশনে পৌঁছে দেন, আর হংকংয়ের এক তরুণী শহরের টিকিট কাটতে সহায়তা করেন। সেখান থেকে শুরু হয় আত্মবিশ্বাসের নতুন অধ্যায়।

বয়সের কারণে প্রত্যাখ্যান, তবু থেমে যাননি

২০১৬ সালে বয়সের কারণে কয়েকটি ট্রাভেল প্রতিষ্ঠান তাঁকে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আর তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—একাই যাবেন দুবাই।

কম খরচে থাকার জন্য বেছে নেন হোস্টেল। ওপরের বাঙ্ক বেডে ঘুমান, নিচে ফিলিপিনো তরুণেরা। অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করে কথোপকথন, হাতে আঁকা মানচিত্রে শহর ঘোরা—ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নতুন অভিজ্ঞতা। এরপর ২০১৭-১৯ সালের মধ্যে তিনি চীনের তিব্বত থেকে হলুদ নদীর মোহনা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকা

২০২৪ সালের শেষ এবং ২০২৫ সালের শুরুতে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ভ্রমণ করেন। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এক তরুণ তাঁকে রাইড-হেইলিং অ্যাপ ইনস্টল করে দেন।

এ ছাড়া তিনি প্রায়ই চীনা মালিকানাধীন হোটেল বেছে নেন এবং অনুবাদ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন যোগাযোগের জন্য।

আফ্রিকার যাত্রা

২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি পৌঁছান আফ্রিকায়। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক তরুণ ভ্লগার বিস্মিত হন ৮২ বছর বয়সী এক মানুষকে বিশাল ব্যাকপ্যাক কাঁধে হাঁটতে দেখে। তানজানিয়ায় ভারত মহাসাগরে ডলফিনের সঙ্গে তিনি সাঁতার কাটেন। কেনিয়ায় তাঁর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষের প্রশংসা কুড়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপে দাঁড়িয়ে তিনি ডায়েরিতে লেখেন, ‘৮০ পেরিয়ে দুই সাগরের মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যেন আবার যৌবনকে দেখছি।’

সরল জীবন, বড় স্বপ্ন

প্রতিটি সফর প্রায় এক মাসের। খরচ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার ইউয়ান—তাঁর এক বছরের পেনশনের সমান। ছেলে তাঁকে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দিলেও তিনি ব্যয় করেন বেশ হিসাব করে। সব সময় তিনি সঙ্গে রাখেন দুটি ব্যাগ—একটি ৬০ লিটারের ব্যাকপ্যাক, অন্যটি পাসপোর্ট ও বইয়ের জন্য। সাহিত্যপ্রেমী এই মানুষ ভ্রমণেও হারমান হেসের বই সঙ্গে রাখেন।

এখনই থামার ইচ্ছা নেই দু লংয়ের। আনলু সাঁতার সমিতির সদস্য এই প্রবীণ অভিযাত্রী পরবর্তী লক্ষ্য ঠিক করেছেন আমেরিকা মহাদেশ। ৮২ বছর বয়সেও তাঁর চোখে নতুন অভিযানের আলো। বয়স নয়, ইচ্ছাই যে আসল শক্তি, দু লং তারই জীবন্ত প্রমাণ।

সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত