Ajker Patrika

লটারি জিতেও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা যাচ্ছে না যে শহরে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
লটারি জিতেও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা যাচ্ছে না যে শহরে
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এখন লটারিতে কোটি কোটি ওন জিতেও একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট কেনা যাচ্ছে না! ছবি: উইকিপিডিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এখন এমন এক অবস্থা, যেখানে লটারিতে কোটি কোটি ওন জিতেও একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট কেনা যাচ্ছে না! বাড়ির দাম এত দ্রুত বেড়েছে যে ভাগ্যের জোরেও মধ্যবিত্তের জীবন বদলানো কঠিন হয়ে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী শহরটিতে।

৪০ বছর বয়সী চো সু-চুল বহু বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে লটারির টিকিট কিনছেন। তিনি এখনো ভাড়া বাসায় থাকেন। বাড়ির বাজার যখন লাগামছাড়া, তখন তাঁর কাছে লটারি ছিল নিজের ঘর পাওয়ার শেষ আশা। কিন্তু সম্প্রতি তিনি জানতে পারেন, ২০২৫ সালে গড় জ্যাকপট জিতলেও কর পরিশোধের পর হাতে যা থাকে, তা সিউলের গড় অ্যাপার্টমেন্টের দামের চেয়ে কম।

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজের বাড়ি থাকা অনেকের কাছে বিয়ে, পরিবার গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার শর্ত। ফলে বাড়ির দামের ঊর্ধ্বগতি মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। ছবি: উইকিপিডিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজের বাড়ি থাকা অনেকের কাছে বিয়ে, পরিবার গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার শর্ত। ফলে বাড়ির দামের ঊর্ধ্বগতি মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। ছবি: উইকিপিডিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় লটারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডং হ্যাং লটারি জানায়, ২০২৫ সালে গড় জ্যাকপট ছিল প্রায় ২ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ওন বা প্রায় ১৮ কোটি টাকা। কিন্তু কর কেটে বিজয়ীরা হাতে পান মাত্র ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ওন বা প্রায় ১২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সিউলে একটি গড় অ্যাপার্টমেন্টের দাম পৌঁছেছে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ওনে বা প্রায় ১৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ হিসাবটা সহজ, প্রথম পুরস্কার জিতলেও নিজের শহরে একটি সাধারণ বাসস্থান কেনা সম্ভব নয় সিউলের মানুষের।

বাড়ির দাম কেন এত বেড়েছে

সিউল বহু বছর ধরে বিশ্বের ব্যয়বহুল শহরগুলোর তালিকায় রয়েছে। শুধু প্রশাসনিক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়, এটি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও করপোরেট কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর, শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের অধিকাংশ সুযোগ এই শহরে কেন্দ্রীভূত। ফলে সারা দেশ থেকে মানুষ কাজ ও উন্নত জীবনের আশায় সিউলে আসছে। এই উচ্চ জনঘনত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমিত আবাসনযোগ্য জমি। শহরটি পাহাড়বেষ্টিত এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। নতুন আবাসন প্রকল্প হাতে নিলেও তা চাহিদার তুলনায় কম। এর সঙ্গে রিয়েল এস্টেটকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। অনেক পরিবার একাধিক ফ্ল্যাট কিনে রাখে ভবিষ্যতের লাভের আশায়। ফলে প্রকৃত বসবাসের প্রয়োজনের বাইরেও বিনিয়োগমূলক চাহিদা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

এই চাহিদা ও সরবরাহের দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতার কারণে বাড়ির দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে গড় বাড়ির দাম ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ওনে পৌঁছায়। অল্প সময়ের এই বৃদ্ধি জানিয়ে দেয়, বাজার এখনো উত্তপ্ত এবং মূল্যস্ফীতির চাপ থামার কোনো ইঙ্গিত নেই।

লটারির অঙ্ক কেন কমছে

এখানে আরেকটি বৈপরীত্য আছে। ২০২৫ সালে লটারির বিক্রি রেকর্ড ছুঁয়েছে। প্রায় ৬ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ওনের টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু বেশি মানুষ টিকিট কিনলে জ্যাকপট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। ২০২৫ সালে ৮১২ জন জ্যাকপট জিতেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ফলে পুরস্কারের অঙ্ক ভাগ হয়ে প্রত্যেকের প্রাপ্তি কমেছে। গড় জ্যাকপট ২০২২ সালের ২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ওন থেকে নেমে ২০২৫ সালে ২ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। তিন বছর ধরে পুরস্কারের গড় অঙ্ক কমার ধারাই বজায় রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাড়ির দাম যখন মানুষের আয় ও সঞ্চয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন অনেকে ভাগ্যের ওপর ভরসা করতে শুরু করেন। কিন্তু এখন সেই ভাগ্যও আর জীবন বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী নয়।

সামাজিক প্রভাব

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজের বাড়ি থাকা সামাজিক মর্যাদা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। অনেকের কাছে এটি বিয়ে, পরিবার গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার শর্ত। ফলে বাড়ির দামের ঊর্ধ্বগতি মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লটারি যখন ‘শেষ ভরসা’, তখন তা সমাজে হতাশা ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। চো সু-চুল বলেন, ‘এখন লটারি জিতলেও একজন কর্মজীবী মানুষের জীবন বদলায় না।’ এই একটি বাক্যই বর্তমান সিউলের রিয়েল এস্টেট বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

সূত্র: কোরিয়া টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত