Ajker Patrika

ডায়না অ্যাওয়ার্ড জয়ের স্বপ্ন যাঁদের

ক্যারিয়ার ডেস্ক
ডায়না অ্যাওয়ার্ড জয়ের স্বপ্ন যাঁদের
মো. আমিমুল এহসান খান

বিশ্বের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ডায়না অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এর বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের মো. আমিমুল এহসান খান। ২০২২ সালে তিনি এই একই প্ল্যাটফর্ম থেকে ডায়না অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। চার বছর পর সেই প্ল্যাটফর্মেই বিচারকের আসনে বসার সুযোগ পেলেন। বাংলাদেশি তরুণেরা কীভাবে এই মর্যাদাপূর্ণ ডায়না অ্যাওয়ার্ডের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন, অভিজ্ঞতার আলোকে জানিয়েছেন তিনি।

আমিমুল এহসান জাপানের টোকিও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি বৈশ্বিক তরুণ নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট লিড হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি জাপানের এশিয়ান বিজনেস নেটওয়ার্কে মার্কেটিং ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করছেন।

ডায়না অ্যাওয়ার্ড কী

ডায়না অ্যাওয়ার্ড বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ যুব স্বীকৃতি। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা তরুণদের নেতৃত্ব, উদ্যোগ এবং অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার দেওয়া হয়। যাঁরা নিজেদের সমাজ, দেশ বা বৈশ্বিক পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হন, তাঁদের সম্মানিত করা হয় এই পুরস্কারের মাধ্যমে। এটি পরিচালনা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডায়না অ্যাওয়ার্ড চ্যারিটি। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়।

কেন এই পুরস্কার

তরুণদের সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের কাজকে আরও বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে নিতে উৎসাহিত করাই এ পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, লৈঙ্গিক সমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করা তরুণদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতেই দেওয়া হয় এই স্বীকৃতি।

নামকরণের পেছনের গল্প

ব্রিটেনের মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব প্রিন্সেস ডায়ানার স্মরণে এ পুরস্কারের নামকরণ করা হয়। সহমর্মিতা, মানবিকতা ও সেবার যে মূল্যবোধ তিনি ধারণ করতেন, ডায়না অ্যাওয়ার্ড সেই উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে।

কারা মনোনীত হতে পারেন

সাধারণত ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেন। তবে আবেদন সরাসরি করা যায় না। প্রার্থীকে শিক্ষক, মেন্টর, প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা তাঁর কাজ সম্পর্কে অবগত কোনো ব্যক্তি মনোনয়ন দেন।

যোগ্যতার মানদণ্ড

ডায়না অ্যাওয়ার্ডে তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিশ্রুতি; নেতৃত্বের প্রমাণিত প্রভাব এবং পরিমাপযোগ্য সামাজিক পরিবর্তন। শুধু কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজন বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলেই এই পুরস্কার পাওয়া যায় না। বিচারকেরা দেখতে চান, একজন তরুণ ধারাবাহিকভাবে কতটা প্রভাব সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর কাজ বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

আমিমুলের ডায়না অ্যাওয়ার্ড যাত্রা

২০২২ সালে ডায়না অ্যাওয়ার্ড পান আমিমুল এহসান খান। তখন তিনি অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর সিনিয়র আঞ্চলিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল লৈঙ্গিক সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি।

তাঁর মনোনয়নপত্রে উল্লেখ ছিল, তিনি ৩০টির বেশি কর্মশালা পরিচালনা করেছেন, যা সরাসরি আড়াই হাজারের বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ৪০টির বেশি দেশের ৫০০-এর বেশি তরুণকে সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত করতে ভূমিকা রেখেছেন।

বর্তমানে তিনি অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রধান হিসেবে ফেলোশিপ কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। এর মাধ্যমে ৭০টির বেশি দেশের প্রায় ৫০ হাজার তরুণ নেতৃত্ব উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনার সুযোগ পাচ্ছেন। আমিমুল বলেন, ‘প্রিন্সেস ডায়ানার জীবন ও মানবিকতা আমাকে ছোটবেলা থেকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর সহমর্মিতা, বিনয় ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা সমাজের জন্য কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছে। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কার পাওয়া এবং পরে একই প্ল্যাটফর্মে বিচারক হওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অসাধারণ এক যাত্রা।’

যেভাবে বিচারক হলেন

ডায়না অ্যাওয়ার্ডের বিচারক হিসেবে সাধারণত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞ সামাজিক নেতা, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পূর্ববর্তী পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচন করা হয়। আমিমুলের দীর্ঘদিনের সামাজিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক যুব উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং ডায়না অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত হিসেবে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁকে ২০২৬ সালের বিচারক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিচারকের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল একটি প্রক্রিয়া, কারণ, এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসাধারণ তরুণদের কাজ মূল্যায়নের সুযোগ পাওয়া যায়।

যেভাবে মনোনয়ন পাবেন

বাংলাদেশের তরুণেরাও এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, নারী ও শিশু অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন—এমন তরুণেরা তাঁদের শিক্ষক, মেন্টর বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মনোনয়ন পেতে পারেন। প্রতিবছর ডায়না অ্যাওয়ার্ড কর্তৃপক্ষ মনোনয়ন আহ্বান ও সময়সীমা ঘোষণা করে। আগ্রহীদের সেই সময়সীমা অনুসরণ করে আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

পুরস্কার পেলে সুযোগ-সুবিধা কী

পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান এবং তাঁদের কাজ স্থায়ীভাবে নথিভুক্ত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনা, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ববিষয়ক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। আমিমুল বলেন, ‘ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি এবং প্রিন্স উইলিয়ামের পক্ষ থেকে অভিনন্দন বার্তা পাওয়া ছিল আমার জন্য বিশেষ সম্মানের।’

তরুণদের জন্য বার্তা

আমিমুলের পরামর্শ হলো মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করা উচিত। তাই ছোট পরিসরে শুরু করুন, ধারাবাহিক থাকুন, মানুষের প্রয়োজন বোঝেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করুন। বড় পদ বা বিপুল সম্পদ নয়, আন্তরিকতা ও প্রতিশ্রুতিই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত