একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মানবজাতি অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। আকাশচুম্বী দালানকোঠা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেগা প্রকল্পের চাকচিক্যে আমাদের বাহ্যিক জীবন রূপ নিয়েছে এক ঝলমলে উপাখ্যানে। কিন্তু আলোঝলমলে এই অবয়বের অন্তরালে আমাদের সমাজব্যবস্থা আজ এক ভয়াল অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের মধ্যেই চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয় আজ মহামারি আকার ধারণ করেছে। সত্যবাদিতা, সততা, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের মতো মৌলিক মানবীয় গুণগুলো যেন ধীরে ধীরে জাদুঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। অন্যায়ের দাপট, দুর্নীতি, হিংসা-বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি চরম উদাসীনতা আজ গোটা সমাজকে এক গভীর দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কিন্তু মানবসভ্যতার মূল চালিকাশক্তি কোনো বাহ্যিক অট্টালিকা নয়, বরং তার নাগরিকদের চরিত্র ও নৈতিকতা। প্রশ্ন উঠছে, এই চরম চারিত্রিক অধঃপতনের পেছনের মূল কারণ কী? এবং একটি ধ্বংসোন্মুখ সমাজকে কীভাবে আবার সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
ইসলামে মানুষের স্বভাব-চরিত্র, মেজাজ ও আচরণ বোঝাতে ‘আখলাক’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। সততা, বিনয়, ক্ষমা, ধৈর্য ও সুন্দর আচরণই মানব চরিত্রের মূল অলংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই ইমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।’ (জামে তিরমিজি)
মানুষের এই চারিত্রিক বিচ্যুতি বা পরিবর্তন এক দিনে ঘটে না। মহান আল্লাহ মানব প্রকৃতিতে এক অনন্য বৈচিত্র্য রেখেছেন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর মতে, মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে জন্মগত এবং কিছু বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয় তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। মানবসত্তা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: ১. জীবসত্তা: যা আহার, নিদ্রা ও শারীরিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২. মানবসত্তা: যা বুদ্ধি, বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়। যখন মানুষের বুদ্ধি ও বিবেককে হারিয়ে তার শারীরিক প্রবৃত্তি বা জীবসত্তা প্রধান হয়ে ওঠে, তখনই সমাজে অবক্ষয়ের সূচনা হয়।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মানুষের স্বভাব-চরিত্র পরিবর্তনশীল। নিয়মিত অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি এবং সৎসঙ্গের মাধ্যমে অবক্ষয়গ্রস্ত মানুষও আবার চরিত্রবান হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সমাজে নীতি-নৈতিকতার এই দুর্ভিক্ষের পেছনে বেশ কয়েকটি মৌলিক কারণ কাজ করছে:
১. আল্লাহভীতি ও পরকালীন জবাবদিহির অভাব: অবক্ষয়ের প্রধানতম কারণ হলো মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) এবং মৃত্যুর পর পরকালে নিজ কর্মের হিসাব দেওয়ার চেতনা বিলুপ্ত হওয়া। আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও যে অন্তর্যামী আল্লাহর চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব—এই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার কারণেই মানুষ প্রকাশ্যে ও গোপনে জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।
২. নৈতিক শিক্ষার অবহেলা: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে ডিগ্রিধারী ও অর্থ উপার্জনের যোগ্য করে তুললেও ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার পাঠ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতির কারণে উচ্চশিক্ষিতদের একটি বড় অংশ আজ বড় বড় দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
৩. পারিবারিক তরবিয়তের অভাব: পরিবার হলো নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা। কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পিতা-মাতা উভয়েই অর্থনৈতিক দৌড়ঝাঁপে এত ব্যস্ত যে সন্তানদের আত্মিক ও চরিত্র গঠনে সময় দিতে পারছেন না।
৪. আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার: অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল সিনেমা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার তরুণদের মনস্তত্ত্বকে মারাত্মকভাবে বিকৃত করছে। পশ্চিমা ও ভিনদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে সামাজিক শিষ্টাচার হারিয়ে যাচ্ছে।
৫. মাদকাসক্তি ও অসৎ সঙ্গ: মাদক হলো সমস্ত অপকর্মের চাবিকাঠি। মাদকের টাকা জোগাড় করতে এবং অসৎ সঙ্গের প্রভাবে তরুণ ও যুবসমাজ কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে মেতে উঠছে।
এই মারাত্মক চারিত্রিক ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো ইসলামের অমোঘ নীতি ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। সমাজসংস্কারে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা: আইন বা পুলিশ পাহারা দিয়ে সাময়িকভাবে অপরাধ কমানো গেলেও স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। একমাত্র আল্লাহর ভয়ই মানুষকে নির্জন অন্ধকারেও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে।
২. সালাত বা নামাজের পাবন্দি: পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সবাইকে নামাজে অভ্যস্ত করতে হবে। কোরআনে এর স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত: ৪৫)
৩. সৎসঙ্গ ও ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি: ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’—কথাটি চিরন্তন সত্য। সন্তানরা কাদের সঙ্গে ওঠাবসা করছে, পিতামাতাকে তা নজরদারি করতে হবে। সুরা তাওবায় আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদী ও বিশ্বস্তদের সঙ্গী হও।’
৪. দ্রুতগতি বিচার ও সামাজিক প্রতিরোধ: অপরাধীকে ছাড় না দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি প্রয়োগ, মুখে নিষেধ করা এবং অন্তত অন্তরে ঘৃণা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
নৈতিকতাহীন আধুনিকতা কোনো সমৃদ্ধি নয়, বরং তা ধ্বংসের পূর্বাভাস। একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সুশীল সমাজ গঠনে বস্তুগত উন্নতির চেয়ে মানুষের চারিত্রিক উন্নয়ন বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’

ইসলাম ধর্মে জুমার দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এটি সপ্তাহের সেরা দিন এবং মুমিন মুসলমানদের জন্য এক অনাবিল আনন্দের উপলক্ষ। দিনটিকে ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। জুমার নামাজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শরিয়তের বিধান ও গুরুত্ব বোঝার জন্য নিচে ৫টি মৌলিক তথ্য আলোচনা করা হলো:
২ ঘণ্টা আগে
প্রশ্ন: সমাজে প্রচলিত আছে যে কোনো ব্যক্তি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে বা কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলে তাঁর সুস্থতা বা জীবনরক্ষার কামনায় ‘জানের বদলে জান’ হিসেবে মুরগি, ছাগল বা গরু সদকা করা হয়। এভাবে মানত করা কি জায়েজ? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে?
২ ঘণ্টা আগে
দৃশ্যমান নাপাকি বা অপবিত্রতা থেকে মানুষ অজু ও গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে। কিন্তু মানবজীবনের আত্মিক পবিত্রতার প্রধান ভিত্তি হলো হালাল উপার্জন। বস্তুত, হালাল উপার্জনের মাধ্যমে একজন মুমিনের বাহ্যিক ও আত্মিক—উভয় জীবনই পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। কারণ যার উপার্জনের পথ হালাল ও বিশুদ্ধ, তার জীবন-জীবিকার
৩ ঘণ্টা আগে
গাজা শহরের এক ক্লান্ত-শ্রান্ত ফুটপাতের সংকীর্ণ কোণ। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব আলহাজ রাফাত জাবের। তাঁর কোলের ওপর পোড়া প্রচ্ছদ আর ছিন্নভিন্ন কিছু কাগুজে পাতা। হাত দুটো অতি পরম মমতায় পাতাগুলোকে কুড়িয়ে একত্র করছে; যেন ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়া কোনো হারিয়ে যাওয়া
৪ ঘণ্টা আগে