Ajker Patrika

আশরাফ আলী থানভি: আধ্যাত্মিক জাগরণের কালজয়ী মনীষী

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন নোমান আরীফী
আশরাফ আলী থানভি: আধ্যাত্মিক জাগরণের কালজয়ী মনীষী
মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.)। ছবি: সংগৃহীত

উপমহাদেশের ইসলামি চিন্তাধারা ও আধ্যাত্মিক সংস্কারের ইতিহাসে মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৮৬৩ সালে (১২৮০ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের থানা ভবনে জন্মগ্রহণকারী এই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক।

শৈশব ও প্রখর স্মৃতিশক্তি

শৈশবে মাতৃহারা হওয়া এই জ্ঞানতাপস ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। ফারসি ও আরবি ভাষার প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে দেওবন্দের পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করেন।

আধ্যাত্মিক সাধনা ও তরিকতের সেতুবন্ধন

মাওলানা থানভি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক জীবনের মোড় পরিবর্তন হয় বিখ্যাত সুফি সাধক হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তিনি তরিকতের উচ্চশিখরে আরোহণ করেন।

দর্শন: তাঁর মূল দর্শন ছিল শরিয়ত ও তরিকতের মেলবন্ধন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শরিয়ত হলো একটি কাঠামো আর আধ্যাত্মিকতা বা রুহানিয়াত হলো তার প্রাণ। শরিয়তের অনুসরণ ছাড়া আধ্যাত্মিকতা কখনোই পূর্ণতা পায় না।

অমর রচনাবলি: বেহেশতি জেওর ও বয়ানুল কোরআন

মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) ইসলামি সাহিত্যে এক বিশাল ভান্ডার রেখে গেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৪৫টি এবং সংকলিত বয়ানের সংখ্যা ৩২১টির বেশি। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু কাজ হলো:

  • ১. বেহেশতি জেওর: মুসলিম নারীদের জীবনবিধান ও মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে রচিত এই গ্রন্থ উপমহাদেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত। আধুনিক যুগেও এর প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
  • ২. বয়ানুল কোরআন: কোরআনের অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল তাফসির, যা সাধারণ মানুষ ও আলেম সমাজ—উভয় মহলেই সমান জনপ্রিয়। ৩. ইসলাহি নেসাব: আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রম।

তাঁর লেখাগুলো বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, গুজরাটিসহ বিশ্বের প্রধান সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সমাজসংস্কার ও জীবনদর্শন

মাওলানা থানভি (রহ.) কেবল কিতাব রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া কুসংস্কার দূর করতে কাজ করেছেন। তাঁর ওয়াজ ও নসিহত মানুষের চারিত্রিক সংশোধনে জাদুর মতো কাজ করত। তাঁর মতে, আধ্যাত্মিকতা মানে কেবল নির্জনে ইবাদত নয়, বরং ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি, পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের এক সুষম সমন্বয়।

ইন্তেকাল

১৯৪৩ সালে (১৩৬২ হিজরি) এই মহান মনীষী ইহকাল ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ভারত ও পাকিস্তানের ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মাঝে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়, তবে তাঁর রেখে যাওয়া ইলমি খিদমত আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত