Ajker Patrika

চামড়ার কারুশিল্পে বেলুচি মুসলমানদের মুনশিয়ানা

আরওয়া তাসনিম
চামড়ার কারুশিল্পে বেলুচি মুসলমানদের মুনশিয়ানা

মোহাম্মদ হাসানের হাত দুটো আজ কাঁপছে, চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু চামড়ার ওপর যখন তাঁর সুই-সুতা সগৌরবে চলতে শুরু করে, তখন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায় বয়সের সব ক্লান্তি। নিখুঁত দক্ষতায় তাঁর হাত যেন যন্ত্রের গতিতে ছুটতে থাকে। নানা রঙের সুতার বুননে চামড়ার ক্যানভাসে তিনি ফুটিয়ে তোলেন এমন এক অনন্য কারুকাজ, যার সৌন্দর্য যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের সিব্বি জেলার লহড়ি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান। চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম ও নান্দনিক নকশা তৈরির কাজে তিনি একজন সিদ্ধহস্ত কারিগর।

হাসান জানালেন, চামড়ার ওপর এই সুই-সুতার কাজ (কুন্দি এমব্রয়ডারি) তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর ভাষায়, ‘আমার দাদার আমলে চামড়ার ওপর এভাবে নকশা করার চল ছিল না। পরে আমরাই এর মধ্যে আধুনিকতা নিয়ে আসি এবং চামড়ার পণ্যে এই কারুকাজ শুরু করি।’

হাসানদের এই শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন মানিব্যাগ, নারীদের হ্যান্ডব্যাগ, টিস্যু বক্স, কি-চেইন, জুতাসহ হরেক রকমের নিত্যব্যবহার্য পণ্য।

তবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বুক হতাশা লুকিয়ে আছে হাসানের কণ্ঠে। বাজারজাতকরণের সঠিক পন্থা এবং পণ্যের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় নতুন প্রজন্ম এখন আর এই কাজে কোনো আগ্রহ দেখছেন না।

হাসান আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটা সময় বহু মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু এখন হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র টিকে আছে। আমার ভয় হয়, একদিন হয়তো এই শিল্পটা পুরোপুরি হারিয়েই যাবে। এমনকি আমার নিজের সন্তানেরাও এখন এই কাজ শিখতে রাজি নয়। আমি ওদের বলি—এটা তোমাদের বাপ-দাদার স্মৃতি, একে হারিয়ে যেতে দিয়ো না। কিন্তু ওরা উল্টো প্রশ্ন করে—এই কাজ করে আপনাদেরই যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, আমাদের ভবিষ্যৎ তবে কেমন হবে?’

একদিকে যখন এই প্রাচীন শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, ঠিক তখনই হাসানের জীবনে আশার আলো হয়ে এসেছে ‘তারাক্কি ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। নারীদের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পে দক্ষ করে তুলতে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে তারা।

শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে হাসান এখন নিয়মিত কোয়েটার গাউসাবাদ এলাকায় যান। সেখানে আফগান শরণার্থী নারীদের জন্য পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তিনি নিজেই প্রশিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন।

সেই কেন্দ্রে কাজ শিখছেন ফাতেমা নামের এক আফগান নারী। তিনি বলেন, ‘আগে চামড়ার ওপর সুই-সুতার এই কাজ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এখন এটি শিখতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। কাজটা সত্যিই দারুণ সুন্দর। একবার ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারলে আমি ঘরে বসেই কাজ করতে পারব, যা আমার পরিবারের বাড়তি আয়ের বড় একটা উৎস হবে।’

তারাক্কি ফাউন্ডেশনের মার্কেটিং অ্যান্ড ডিজাইনিং অ্যাসিস্ট্যান্ট সানিয়া রহমত জানান, মূলত আফগান শরণার্থী নারীদের স্বাবলম্বী করতেই তাঁদের এই কেন্দ্রের পথচলা। এবার তাঁরা সেখানে বেলুচিস্তানের এই প্রাচীন চামড়াশিল্পকে যুক্ত করেছেন।

সানিয়া বলেন, ‘বেলুচিস্তানে এই শিল্পের ইতিহাস বহু পুরোনো হলেও এখন মোহাম্মদ হাসানের মতো মাত্র কয়েকজন প্রবীণ কারিগর টিকে আছেন। একটি প্রদর্শনীতে হাসানের তৈরি করা নান্দনিক পণ্যগুলো দেখে আমাদের প্রতিনিধিরা মুগ্ধ হন। তখনই আমরা তাঁকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিই, যাতে এই অনন্য শিল্পটি বিলুপ্ত না হয়ে যায় এবং দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বেলুচিস্তানের একটি বিশেষ পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।’

সানিয়া আরও যোগ করেন, ‘যন্ত্রের তৈরি জিনিস আর হাতের কাজের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। হাতের কাজের সৌন্দর্যই আলাদা। আমাদের প্রতিষ্ঠান হাসানের এই অসাধারণ শিল্পকর্মকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে কাজ করে যাচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত