Ajker Patrika

উচ্চমূল্যে ভুগছে মানুষ, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর রেকর্ড মুনাফায় খেপেছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
উচ্চমূল্যে ভুগছে মানুষ, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর রেকর্ড মুনাফায় খেপেছেন ট্রাম্প
তেল ও গ্যাস খাতের প্রভাবশালী এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর চরম ক্ষোভ ঝেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যুক্তরাষ্ট্রে তেলের চড়া দামে যখন নাগরিকদের নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক তখনই দেশটির জ্বালানি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রেকর্ড মুনাফা গুণছে। টেক্সাসের হিউস্টনভিত্তিক কোম্পানি শেভরনের রেকর্ড আয়ের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তেল ও গ্যাস খাতের প্রভাবশালী এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর চরম ক্ষোভ ঝেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ গত কয়েক মাস ধরে তেলের বাজার উত্তপ্ত করে রেখেছে। এর মধ্যেই গত সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, এই বিশাল মুনাফা তিনি মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না। ট্রাম্প বলেন, ‘শেভরন অতিরিক্ত টাকা বানাচ্ছে। এক্সনমোবিলও তা-ই করছে। এত টাকা বানানো ঠিক নয়।’

সম্প্রতি ফক্স নিউজের ‘সান্ডে মর্নিং ফিউচারস উইথ মারিয়া বার্টিরোমো’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দেন শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইক ওয়ার্থ। এর পরপরই ট্রাম্প এই মন্তব্য করলেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে কড়া ভাষায় ওয়ার্থের সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর অভিযোগ, তেলশিল্পকে রক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেননি ওয়ার্থ।

ট্রাম্প লেখেন, ‘তিনি (ওয়ার্থ) সুবিধাজনকভাবে শুধু একটি বিষয় বলতে ভুলে গেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মেধা, দূরদর্শিতা, শক্তি ও স্থিতিশীলতা না থাকলে তেলের বাজার, এমনকি আমাদের দেশও আজ ধ্বংস হয়ে যেত!’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে, আর এই সুযোগে গত শুক্রবার গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফার খবর জানিয়েছে শেভরন। তাদের শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় দাঁড়িয়েছে ৬.০৬ ডলার, যার মোট মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

শেভরন তাদের কর্মীদেরও পুরস্কৃত করেছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইক ওয়ার্থ কর্মীদের কাজের প্রশংসা করে এক ই–মেইলে জানান, অধিকাংশ কর্মী তাঁদের এক মাসের মূল বেতনের অর্ধেকের সমপরিমাণ বোনাস পাবেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি অভ্যন্তরীণ ই–মেইলের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে রয়টার্সের এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আল–জাজিরা।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কম হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দামের মূল ফায়দা তুলতে পেরেছে শেভরন। ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক তেলের উচ্চ মূল্যের সুবিধা তুলনামূলক বেশি পেয়েছে তারা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যমান নির্ধারণের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক ‘দ্য পোস্ট ওক গ্রুপ’-এর একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশনস) বিভাগের নির্বাহী পরিচালক বিল ড্রোলেট আল–জাজিরাকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর কম নির্ভরতা নিশ্চিতভাবেই শেভরনকে এগিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি এখানে তাদের যে শোধন করার সক্ষমতা রয়েছে, সেটাও সাহায্য করেছে। হরমুজ অঞ্চলে শেভরনের উপস্থিতি ৫ শতাংশেরও কম হওয়ায় তারা ঝুঁকি মুক্ত থাকতে পেরেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেভরনের মোট উৎপাদনের ৭০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত। আর বর্তমানে সেখান থেকেই তারা সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে।’

এ ছাড়া জানুয়ারিতে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেখানে তেল উৎপাদনের পথ উন্মুক্ত করে দেন। এর বড় সুবিধাও পেয়েছে শেভরন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ তেলশিল্প জাতীয়করণ করার পরও লাতিন আমেরিকার দেশটির বাজারে টিকে ছিল তারা।

তবে আল জাজিরার পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও কোনো সাড়া দেয়নি শেভরন।

প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোম্পানিগুলোর অবস্থাও মন্দ নয়। শুক্রবার এক্সনমোবিল গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফার ঘোষণা দিলেও তা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এক্সনমোবিলও।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন থমকে যাওয়ায় লাভবান হয়েছে মার্কিন শোধনাগারগুলো। ফলে গত বৃহস্পতিবার ভ্যালেরো এনার্জি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দ্বিতীয়-প্রান্তিক মুনাফার কথা জানিয়েছে, যেখানে নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৩৭০ কোটি ডলারে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনায় তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে সুবিধা পেয়েছে, তারই প্রতিফলন দেখা গেছে এ ফলাফলে।

কিন্তু বড় বড় কোম্পানির এই সুবিধার ছিটেফোঁটাও সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি। তেল কিনতে গিয়ে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠছেন গাড়ির মালিকেরা। আমেরিকা জুড়ে পেট্রলের দাম এখন প্রতি গ্যালনে (৩.৭৮ লিটার) ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। দৈনিক পেট্রলের দাম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ দশমিক ০৯ ডলার। গত সপ্তাহের একই সময় যা ছিল ৪ দশমিক ১১ ডলার, তবে এক মাস আগে ছিল ৩ দশমিক ৮২ ডলার।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রথমবার ইরানে হামলা চালানোর সময় প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার।

ব্যাংক অব আমেরিকার এপ্রিলে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চে ভোক্তারা তাঁদের আয়ের সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ শতাংশ পেট্রল কিনতেই ব্যয় করেছেন। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি। ১০ শতাংশের বেশি পরিবারের মাসিক আয়ের ১০ শতাংশেরও বেশি শুধু পেট্রল কেনার পেছনেই ব্যয় হচ্ছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে আমেরিকার ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রলিয়াম রিজার্ভ’ বা কৌশলগত তেলের মজুতের ওপর চাপ বাড়ছেই। জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুসারে, চলতি সপ্তাহে তেলের এই মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এক সপ্তাহেই মজুত ২৮ লাখ ব্যারেল কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেলে।

তেল কোম্পানিগুলোর এই বিপুল মুনাফার সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষ থেকেই এসেছে।

রোববার এক এক্স বার্তায় ডেমোক্রেটিক পার্টির রোড আইল্যান্ডের সেনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস লেখেন, “যেকোনো সৎ শিল্প খাত হয়তো বলতো—‘এই টাকাটা আমাদের পরিশ্রমের নয়, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর ফলে পাওয়া অন্যায্য সুযোগ।’ কিন্তু এই দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী আর ধূর্ত চক্রটি তেমনটা বলবে না। ”

তবে তেলের দাম কমানো অত সহজ নাও হতে পারে। শুধু সাধারণ মানুষের চাপ সামলানোই শেষ কথা নয়, মার্কিন করপোরেট সংস্কৃতির মূল ভিত্তি ‘শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা’। এর অর্থ হলো, সাধারণ ক্রেতাদের কথা ভেবে দাম কমানো ভালো সিদ্ধান্ত হলেও, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তেল কোম্পানিগুলোর পক্ষে তা করা সম্ভব নাও হতে পারে।

পোস্ট ওক গ্রুপের ড্রলেট বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের কাছে তেল কোম্পানিগুলোর জবাবদিহির বিষয় রয়েছে। তারা শেয়ার বাইব্যাক বা লভ্যাংশ বিতরণ কমাতে পারতো, তবে এই মুহূর্তে তেল কোম্পানিগুলো এমন কিছু করবে বলে মনে হয় না।’

তিনি জানান, তিনি যদি কোনো কংগ্রেস সদস্য বা প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিতেন, তবে জ্বালানি তেলের ওপর চাপানো কর (যা বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন) সাময়িকভাবে স্থগিত করাই হতো জনগণকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার সেরা উপায়। যেমন—টেক্সাসে পেট্রলে কর প্রতি গ্যালনে ২০ সেন্ট, আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় তা ৬৩ সেন্ট।

ড্রোলেট বলেন, ‘রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সরকার সবচেয়ে ভালো যে কাজটি করতে পারে, তা হলো গ্যাস কর স্থগিত করা, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ায়। কর সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলে এই কঠিন সময় পার হতে সবারই কিছুটা সহায়তা হবে।’

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চাইলেও প্রেস কার্যালয় কোনো জবাব দেয়নি।

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় তত বড় সংকট হয়ে উঠছে। গত মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের যৌথ জরিপে দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে চড়া দাম এবং অর্থনীতিকেই মূল উদ্বেগ বলে চিহ্নিত করেছেন।

এদিকে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সোমবার দিনের লেনদেনের মাঝামাঝি সময়ে শেভরনের শেয়ারের দাম ২ শতাংশের বেশি কমেছে। তবে গত পাঁচ দিনে শেয়ারটির দাম এখনো ১ দশমিক ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

অন্যদিকে এক্সনমোবিলের শেয়ারের দাম ওই দিন শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। তবে গত পাঁচ দিনে শেয়ারটির মূল্য শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত