Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে মেক্সিকোতেও ছড়িয়ে পড়েছে হাম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে মেক্সিকোতেও ছড়িয়ে পড়েছে হাম
মেক্সিকোর এক শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর সেমিনোলে শুরু হয়েছিল হামের প্রাদুর্ভাব। কিন্তু এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্তের ওপারে মেক্সিকোতেও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে প্রায় নিয়ন্ত্রিত বলে ধরে নেওয়া এই রোগ আবারও দেখিয়ে দিল—টিকাদানে সামান্য অবহেলাও কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

রোববার (১৭ মে) সিএনএন জানায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের শুরুর দিকে। ৯ বছর বয়সী এক বালক তার পরিবারের সঙ্গে টেক্সাসের সেমিনোলে আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যায়। পরে মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়া অঙ্গরাজ্যে নিজের বাড়িতে ফেরার পর তার শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার স্কুলের বহু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্কুলটি বন্ধ করে দিতে হয়।

তখনো পরিবারটি জানত না, তারা টেক্সাসে অবস্থানকালে হাম ভাইরাসের সংস্পর্শে গিয়েছিল। পরবর্তীতে সেমিনোল শহরটি যুক্তরাষ্ট্রের গত তিন দশকের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দেশটিতে হাম এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।

মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হামজনিত জটিলতায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে শিশু যেমন আছে, তেমনি মধ্যবয়সী কৃষিশ্রমিকও রয়েছেন। একই সময়ে দেশটিতে ১৭ হাজারের বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের জন্য দুটি ডোজের এমএমআর (এমএমআর) টিকা অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু আক্রান্তদের অধিকাংশই টিকা নেননি।

মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়া অঙ্গরাজ্যের প্রত্যন্ত মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রথম বড় সংক্রমণ ধরা পড়ে। এই খ্রিষ্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী সাধারণত বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে এবং অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকেন। সেখানে আপেল, গম ও ভুট্টার খামারে কাজ করা আদিবাসী শ্রমিকদের মধ্যেও রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বছরের শেষ নাগাদ শুধু চিহুয়াহুয়াতেই প্রায় ৪ হাজার ৫০০ হাম রোগী শনাক্ত হয়, যা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।

মেক্সিকোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন, ভাইরাসটির ধরন ছিল ‘জেনোটাইপ ডি-৮ ’, যা ২০২৪ সালে কানাডায় দেখা দিয়েছিল এবং পরে টেক্সাসে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেটিই মেক্সিকোর ৩২টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে যায়।

মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক স্যামুয়েল পন্সে দে লেওন বলেছেন, ‘টিকার সাফল্যের কারণেই মানুষ হামকে ভুলে গিয়েছিল। তাই অনেকে ভাবতে শুরু করেছিল, এ নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে?’

বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি হাম। এটি কোভিড-১৯ থেকেও অনেক বেশি সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি কিংবা কথা বলার মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। এমনকি বাতাসে ভাইরাসটি দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে আরও ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেমিনোল থেকে মেক্সিকোতে ফিরে যাওয়া ওই শিশুটির সহপাঠী আর্তেমিও বার্গেন প্রথমে সংক্রমিত হয়। তার জ্বর, পরে শ্বাসকষ্ট ও সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তাকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। তার পরিবার জানায়, কয়েকবার মনে হয়েছিল ছেলেটি বাঁচবে না। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তার আরও তিন ভাইবোন আক্রান্ত হয়।

চিহুয়াহুয়ার একটি মেনোনাইট স্কুলে একসময় এত বেশি শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে যে, এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রছাত্রী স্কুলে অনুপস্থিত ছিল। পরে আশপাশের প্রায় সব স্কুলই বন্ধ হয়ে যায়।

সংক্রমণ দ্রুত শহর ছাড়িয়ে বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, মেনোনাইট সম্প্রদায়ের সদস্যরা সপ্তাহান্তে বড় শহরে কেনাকাটা করতে যেতেন, আর ভাইরাসও তাদের সঙ্গে ভ্রমণ করত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেক্সিকোতে এই সংকটের বড় কারণ ছিল টিকাদান কর্মসূচির দুর্বল হয়ে পড়া। ১৯৮৯-৯০ সালের ভয়াবহ হাম মহামারির পর দেশটি শক্তিশালী টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট সংকোচন, কোভিড মহামারি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে সেই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিহুয়াহুয়ায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুই নির্ধারিত প্রথম হাম টিকা পেয়েছিল। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাম প্রতিরোধে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাপ্রাপ্ত হওয়া প্রয়োজন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মেক্সিকো সরকার ব্যাপক টিকাদান অভিযান শুরু করেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মেনোনাইট এলাকাগুলোতে গিয়ে ঘরে ঘরে টিকা দিয়েছেন। দেশজুড়ে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই কোটি ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকাদানে অবহেলা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। হাম শুধু তাৎক্ষণিক মৃত্যু নয়, দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ওমানে ৪ ভাইয়ের মৃত্যু: মাকে বাঁচাতে ফটকে তালা একমাত্র জীবিত ছেলের

বছরের পর বছর দলবদ্ধ ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল, বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ইরানের নতুন রণকৌশল: হরমুজের তলদেশ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান

জেরুজালেমের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ, ইসরায়েল বলছে ‘পূর্বপরিকল্পিত পরীক্ষা’

বিনা খরচে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে আনছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত