Ajker Patrika

আলোচনার পথে অনিশ্চয়তা

  • লেবাননে হামলা চললে আলোচনা নয়: ইরান
  • হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ট্রাম্পের শঙ্কা।
  • ইসলামাবাদের পথে মার্কিন প্রতিনিধিদল। ইরানিদের যাওয়ার খবর জানা যায়নি।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০০: ০৩
আলোচনার পথে অনিশ্চয়তা
পাকিস্তানে আজ আলোচনায় বসার কথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের। আলোচনার সম্ভাব্য স্থান ইসলামাবাদের রেড জোনে গতকাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান। ছবি: এএফপি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামীকাল শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মুখোমুখি বসার কথা। তবে আলোচনার সময় ঘনিয়ে এলেও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধ, নয়তো যুদ্ধবিরতি বেছে নিতে হবে। হামলার জেরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও লেবানন যুদ্ধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান বেশি; এতে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। ৪০ দিনের যুদ্ধে দুই পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। একটানা ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন নিহত হন। ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধে ইরানের ক্ষতি হয়েছে ১৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর খবর অনুসারে, প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের সরকারের যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। আর ভৌত অবকাঠামোতেই ৩৮০-৪২০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনায় বসতে যাচ্ছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়।

নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ইসলামাবাদ

পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়েছে, এই আলোচনা উপলক্ষে ইসলামাবাদে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। সফররত প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে রাজধানীতে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সেখানে বহুমুখী নিরাপত্তাব্যবস্থার তদারকি করবে সামরিক বাহিনী। তাদের সঙ্গে কাজ করবে আধা সামরিক বাহিনী এবং ইসলামাবাদ ও পাঞ্জাব পুলিশ। রাজধানীর মারগাল্লা রোড ছাড়া রেড জোনের সব প্রবেশপথ বন্ধ থাকবে। শুধু অনুমোদিত কর্মকর্তা ও বাসিন্দাদের মারগাল্লা রোড দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এ ছাড়া সফররত প্রতিনিধিদলের বিমানবন্দর থেকে তাদের থাকার জায়গা পর্যন্ত চলাচলের জন্য আলাদা রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। রুটের দুই পাশে নিরাপত্তা ও পুলিশ সদস্যরা সুরক্ষা প্রদান করবেন এবং প্রতিনিধিদলকে ‘ব্লু বুক’ প্রটোকল দেওয়া হবে।

এই আলোচনায় যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। হোয়াইট হাউস জানায়, ভ্যান্সের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে আরও থাকছেন ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, পাকিস্তানের স্থানীয় সময় শনিবার সকালে এই আলোচনা শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সরাসরি বৈঠকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি।’

এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও স্পিকার বাঘের গালিবাফের। তবে ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল সম্পর্কে সরাসরি কিছু বলা হয়নি।

শঙ্কা যেখানে শুরু

যুদ্ধবিরতির আলোচনা যখন শুরু হতে যাচ্ছে, তার আগেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। এনবিসির খবরে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ বন্ধ রাখায় এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। কারণ হিসেবে কুয়েতে ইরান ও তার মিত্ররা ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।

এদিকে জেডি ভ্যান্স এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও খানিকটা সংশয় রেখেই কথা বলেছেন গতকাল। ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যদি ইরানিরা সৎ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করতে চায়, আমরা অবশ্যই উন্মুক্ত হাত বাড়াতে প্রস্তুত।’ তিনি বলেন, ইরান যদি আলোচনার নামে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় থাকবে না।

জেডি ভ্যান্স বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ‘সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা’ দিয়েছেন। এই আলোচনা ‘ইতিবাচক’ হবে বলে তিনি আশাবাদী।

বেঁকে বসেছে ইরানও

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের হামলা বন্ধ করলেও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ইরান বারবারই বলে আসছে, লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে না। আর যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলছে, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা চায়।

তবে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ গতকালও বলেছেন, যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। এর একটি লেবাননে হামলা বন্ধ। অন্যটি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া। এই দুটি বিষয় অবশ্যই আলোচনার আগে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি হুমকি দিয়েছেন, এসব শর্ত পূরণ না হলে আলোচনা শুরুই হবে না।

তবে লেবাননে হামলা কমার লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গতকালও লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এই হামলা থামাতে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ সময় দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। এ পরিস্থিতিতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

আরও শর্তে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা

এই আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১৫টি দফা ও ইরানের পক্ষ থেকে ১০টি দফা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দফাগুলোর মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ইরান বলছে, তারা পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগের পথে হাঁটবে না। একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও তারা কোনো আলোচনায় রাজি নয়। একই সঙ্গে তারা যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হরমুজে টোল বসানোর ঘোষণাও দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আলোচনা কতটা এগোবে, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকেরা।

এ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পবিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন আলোচনায় ইরান বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধান করা সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইরান সন্দিহান। ফলে দেশ পুনর্গঠনের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তারা সেটা এই হরমুজের টোল থেকে তুলতে চাইবে। আলী ভায়েজের মতে, ইরানের জন্য এবার হরমুজ প্রণালি হলো তাদের ‘লাইফলাইন’।

আরেকটি বিষয় নিয়ে ব্যবধান রয়েছে। সেটি হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। আলী ভায়েজ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতির কারণে এই আলোচনা এগিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হবে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক ব্রেট এইচ ম্যাকগার্ক সিএনএনে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ইরানের সঙ্গে বৈঠকের আগের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, দুই পক্ষের মতপার্থক্য না কমলে আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। অথচ এখন পর্যন্ত মতপার্থক্য কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরান হয়তো হরমুজে নিজেদের আধিপত্যের কার্ড খেলার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী ওই অঞ্চলে এখনো সতর্ক অবস্থানে আছে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে আবারও হামলা শুরু করার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পায়নি বাংলার জয়যাত্রা, শারজা বন্দরে ফিরে যাচ্ছে

আপনার জিজ্ঞাসা: হজের সময় ঋতুস্রাব শুরু হলে নারীদের করণীয়

৪০ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের খরচ কত, ক্ষতিপূরণের আবেদনই পড়েছে ২৮২৩৭টি

ছেলেকে নিয়োগ দিতে সুন্দরগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের জালিয়াতি

ইসলামাবাদে সাজ সাজ রব: ত্রিমাত্রিক সুরক্ষা বলয়, দুই দিনের ছুটি ও ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত