Ajker Patrika

ট্রাম্পের দুর্গে ডেমোক্র্যাটদের হানা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ট্রাম্পের দুর্গে ডেমোক্র্যাটদের হানা
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান শিবির বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে তথা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত চালানোর সুযোগ পাবে বিরোধী দল। প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সিএনএন ও সিএনবিসির নির্বাচনী পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের লড়াই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। নির্বাচনের আগে ৫৩-৪৭ আসনে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসনে নিট জয় প্রয়োজন ছিল। ইতিমধ্যে ৩টি রিপাবলিকান আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে এক ধরনের গণরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে এই নির্বাচনকে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের জনসমর্থনের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।

নির্বাচনের রাতে সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি আসে দক্ষিণ ক্যারোলিনা থেকে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্বাভাসে জানানো হয়। ডারলেইন গ্রাহামকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। গত জুলাইয়ে তাঁর ভাই এবং দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে ডারলেইনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ ক্যারোলিনা ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি। অঙ্গরাজ্যটিতে ১৯৯৮ সালের পর কোনো সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি ডেমোক্র্যাটরা।

এর আগে নর্থ ক্যারোলিনাতেও সিনেটের একটি আসন হারায় রিপাবলিকানরা। সেখানে জনপ্রিয় সাবেক গভর্নর রয় কুপার ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে, জর্জিয়ায় দলের উদীয়মান নেতা জন অসফ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারে জয় পেয়েছেন ক্রিস পাপাস। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের ফলাফলও রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট করেছে। সাধারণত রিপাবলিকানদের শক্তিশালী এলাকা হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন অঞ্চলেও জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ইন্ডিয়ানায় রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেডি ফোর্ড। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই আসনে ১৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। ফলে সেখানে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সম্ভাব্য ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক নির্বাচনী সাফল্যের প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখছেন।

এ ছাড়া নর্থ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা প্রতিনিধি পরিষদের আরেকটি আসন নিজেদের করে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফ্লোরিডার ফলাফলও ইঙ্গিত দিয়েছে, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা যে বাড়তি আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল, তা পূরণ হচ্ছে না।

জর্জিয়ায় গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন আটলান্টার সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র কেইশা ল্যান্স বটমস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গভর্নর নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে জর্জিয়ায় রিপাবলিকানদের টানা ২৪ বছরের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের কিছু জয়ও এসেছে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে। ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত বায়রন ডোনাল্ডস জয় পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হয়েছেন। রিপাবলিকান অ্যাশলি মুডিও তাঁর সিনেট আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ। তাঁর ভাষায়, এই ফলাফল ট্রাম্পের ‘নৈতিক অধঃপতন, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার’ বিরুদ্ধে জনগণের অবস্থানের প্রতিফলন।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে হোয়াইট হাউসে অবশ্য অনমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মহলে মনোভাব ছিল ‘প্রতিরোধে অনড়’। নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্প ‘উগ্র বামপন্থীদের’ বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে সতর্ক করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সামনের সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি ইরান যুদ্ধ, ব্যাপক হারে অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে। পাশাপাশি নতুন আইন পাসের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পকে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হারালে বিচারক পদে মনোনয়ন এবং প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে উঠবে।

নির্বাচনী প্রচারে ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল প্রধান উদ্বেগের বিষয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের ২৪ বছর বয়সী ভোটার টেইলর কুক এএফপিকে বলেন, ‘বাড়িভাড়া, মুদিপণ্যের দাম, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল এবং সম্পত্তিকর ক্রমাগত বাড়ছে। আমি চাই, কংগ্রেসে এমন প্রতিনিধিরা থাকুন, যাঁরা মানুষের ব্যয় কমাতে বাস্তবিক অর্থেই কিছু করবেন।’

নির্বাচনের আগে মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকারে নিজের প্রশাসনের নীতির পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। তিনি শুল্কনীতি, অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। ফক্স নিউজকে ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান রাখতে হবে। এখন আমরা মহান। দুই বছর আগে আমরা ভয়াবহ অবস্থায় ছিলাম।’

বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের সম্ভাবনা নিয়ে আগেই মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। সোমবার প্রকাশিত এক পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’ তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কংগ্রেসের তদন্তের প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগীয় ও শীর্ষ প্রশাসনিক নিয়োগের ভবিষ্যৎ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত