Ajker Patrika

আমরা আর দেরি করব না—দায়িত্ব নিয়েই মামদানির ঘোষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বিশ্বের অন্যতম ধনী শহর নিউইয়র্কের বুকে গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন বছরের শুরুতে যখন জোহরান মামদানি মেয়র হিসেবে শপথ নেন, তখন দৃশ্যটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। চারদিকে জনস্রোত, সাত ব্লকজুড়ে উৎসব, আর আকাশ কাঁপানো স্লোগান—‘ধনীদের ওপর কর আরোপ কর’—এভাবেই স্বাগত জানাল শহর তার নতুন নেতৃত্বকে।

সাধারণত রাজনৈতিক অভিষেক অনুষ্ঠান হয় বেশ গম্ভীর, নিরাবেগ ও প্রোটোকলের বাঁধনে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার মতোই মামদানি পুরো নিয়মটাই উল্টে দিলেন। প্রথম অধ্যায় শুরু হয় মধ্যরাতে। ২০২৬ সালের নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে নিউইয়র্ক সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনের ঐতিহাসিক সিঁড়ির সামনে ছোট এক অনুষ্ঠানে তিনি দায়িত্বের শপথ নেন।

নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিয়া জেমস শপথ বাক্য পাঠ করান। পাশে ছিলেন মামদানির স্ত্রী রামা দুয়াজি। অনুষ্ঠানটি হয় সেই ট্রানজিট হাবের ভেতরে, যাতে ১৯৪৫ সাল থেকে যাত্রীসেবা বন্ধ। শপথ গ্রহণের জন্য তিনি ব্যবহার করেন নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে আনা এক ঐতিহাসিক কোরআন, আর আরেকটি কোরআন ছিল তাঁর দাদার।

এরপর এল বড় আকারের গণউদযাপন। নববর্ষের দিন সিটি হলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মামদানি আবার শপথ নেন। প্লাজা পেরিয়ে আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের ঢল। তীব্র শীত আর কাঁপানো বাতাস উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ভিড় জমায়। নতুন মেয়রের পাশাপাশি নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার মার্ক লেভাইন ও পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানি উইলিয়ামসও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন সেখানে। কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ এবং ভার্মন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স নতুন নেতৃত্বের পাশে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তাঁরা জানিয়ে দেন, নিউইয়র্কে প্রগতিশীল আন্দোলনের শাসনদর্শন শুধু এ শহরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।

স্যান্ডার্স বলেন, ‘আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শ্রমজীবী মানুষ এক হলে এবং ধনীদের আমাদের ভেঙে দিতে না দিলে, এমন কিছু নেই যা আমরা করতে পারি না।’ বক্তব্যের পরই তিনি মামদানিকে শপথ পাঠ করান।

অতিথিরা যখন সিটি হল প্রাঙ্গণে, তখন বাইরে শুরু হয় সাত ব্লকজুড়ে বিশাল ব্লক পার্টি। সাধারণত যেখানে টিকিটধারীদের জন্য সীমিত আয়োজন হয়, সেখানে এবার ছিল নতুন ব্যবস্থা। যে কেউ নিবন্ধন করলেই ঠান্ডা আর তুষার উপেক্ষা করে যোগ দিতে পারত এই উদ্‌যাপনে। অনেকে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। অনেকেই শপথ শেষ হওয়ার আগেই ভেতরে ঢুকতে পারেননি। দূর থেকে করতালি, হর্ন আর উল্লাস ভেসে এসেছে। আবার কয়েকজন প্রতিবাদীও পুলিশের ব্যারিকেডের পেছনে দাঁড়িয়েছিল।

ডেমোক্রেটিক কৌশলবিদ নোমিকি কনস্ট আল–জাজিরাকে বলেছেন, এই ব্লক পার্টি নিজেই ছিল এক প্রতীক। যারা আগে কখনো রাজনীতির ভেতরে ঢোকেনি, সেই জনতার দিকে হাত বাড়ানোর চেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এটা এমন এক দরজা খোলা, যা এত দিন সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ ছিল। নিউইয়র্কের রাজনৈতিক ভেতরের বৃত্তের অংশ না হলে কেউ এসব দেখতে পেত না। এই আয়োজন ছিল সেই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যারা তাঁকে ক্ষমতায় এনেছে।’

মামদানি, উইলিয়ামস আর লেভাইন নিউইয়র্কের সবার ঐক্যের কথা বলেন। তাঁরা কথা বলেন ইংরেজি, স্প্যানিশ, হিব্রু ও গ্রিক ভাষায়। মঞ্চে ছিলেন ইসলাম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মীয় নেতারাও। শপথ নিয়ে লেভাইন বলেন, ‘আমাদের তিনটি শপথ। একজন কোরআন ব্যবহার করে, একজন খ্রিষ্টান বাইবেল, আরেকজন হিব্রু বাইবেল। আমি গর্ব করি এমন শহরে বাস করি, যেখানে এটা সম্ভব।’

মামদানিও সেই সুরই তুললেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এ শহরের মানুষকে আরও কাছাকাছি আনব। শীতল স্বার্থপরতার বদলে আমরা নিয়ে আসব সমষ্টির উষ্ণতা। আমাদের প্রচারণা যদি দেখিয়ে থাকে যে নিউইয়র্কবাসী ঐক্য চায়, তাহলে এই সরকার সেই ঐক্য গড়ে তুলবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাজ হবে প্রতিদিন এই শহরকে তার মানুষের আরও বড় অংশের করে তোলা।’

কিন্তু পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে মূল যে কথা বারবার ফিরে এসেছে, সেটি হলো ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ। মামদানি, লেভাইন, উইলিয়ামস, স্যান্ডার্স ও ওকাসিও-কর্তেজ সবার কণ্ঠেই ছিল সেই অঙ্গীকার। স্যান্ডার্স বলেন, ‘ধনী ব্যক্তি আর বড় বড় কোম্পানিগুলো যেন ন্যায্য কর দেয়, এটা কোনো কট্টর দাবি না। এটা ঠিক কাজ।’ তাঁর কথার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত জনতা স্লোগান দিতে শুরু করে ‘ধনীদের ওপর করারোপ কর।’

মামদানির নির্বাচনী অঙ্গীকারের বড় অংশই ছিল করনীতি। তিনি করপোরেট কর ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ করতে চান, যা নিউজার্সির সমান। বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয়কারীদের ওপর কর বাড়ানোর কথাও বলেছেন। তবে এ জন্য গভর্নরের অনুমোদন লাগবে।

মামদানি বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন এসেছে আট দেড় মিলিয়ন মানুষের জীবনের ভেতর থেকে। ট্যাক্সি গ্যারেজ থেকে, আমাজন গুদাম থেকে, ডিএসএ মিটিং থেকে, রাস্তার ধারে ডমিনো খেলার টেবিল থেকে। ক্ষমতাবানরা এসব জায়গাকে ‘কোথাও না’ বলে ভেবেছিল। কিন্তু আমাদের শহরে কোনো ‘কোথাও না’ নেই, কোনো ‘কেউ না’ নেই।’

বাসস্থান ও ভাড়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে। তাঁর বড় অঙ্গীকারগুলোর একটি হলো, ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বৃদ্ধি বন্ধ করা। এ ধরনের বাসা নিউইয়র্ক সিটির ভাড়াবাড়ির বড় অংশ। তিনি বলেন, ‘যারা ভাড়া নিয়ন্ত্রিত বাসায় থাকেন, তারা আর ভাড়া বাড়ার আতঙ্কে বাঁচবেন না। আমরা ভাড়া স্থির করব।’

শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই মামদানি আবাসনভিত্তিক একগুচ্ছ নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের নতুন প্রশাসনের প্রথম দিন। আজকের দিনেই অসংখ্য মানুষের ভাড়া দেওয়ার দিন। আমরা দেরি করব না।’ তিনি ব্রুকলিনের একটি ভবনে দাঁড়িয়ে তিনটি নির্বাহী ঘোষণা দেন। শহরের মালিকানাধীন জমি আবাসনের জন্য চিহ্নিত করতে একটি টাস্কফোর্স এবং নতুন আবাসন উন্নয়নের পথ খুঁজতে আরেকটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন।

ডেপুটি মেয়র ফর হাউজিং অ্যান্ড প্ল্যানিং লেইলা বোর্জর্গ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আবাসন সংকটই আমাদের সামর্থ্য সংকটের কেন্দ্রে। আমরা ভাড়াটেদের সুরক্ষা দেব, খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব, আর আরও বাড়ি নির্মাণ করব। সত্যিকারের সমাধান সেখানেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো নীতিগত সিদ্ধান্ত, যেগুলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে করা সম্ভব। আর মামদানি সেটাই করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত