Ajker Patrika

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে রাশিয়ায় নিরাপদে ঘুমাচ্ছেন বাশার আল-আসাদ, কী ভাবছে সিরিয়ার মানুষ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে রাশিয়ায় নিরাপদে ঘুমাচ্ছেন বাশার আল-আসাদ, কী ভাবছে সিরিয়ার মানুষ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতন হয়। ছবি: সংগৃহীত

‘ইজাক এল দোর, ইয়া ডক্টর’—এবার তোমার পালা, ডাক্তার!

সেই ডাক্তারের ‘পালা’ অবশেষে এসেছে বটে, তবে তিনি আর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে নেই। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সেই ‘ডাক্তার’ এখনো নিরাপদে ঘুমাচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ায়।

২০১১ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরের একদল কিশোর স্কুলের দেয়ালে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি এঁকেছিল। সেখানেই লেখা ছিল—‘ইজাক এল দোর, ইয়া ডক্টর’—এবার তোমার পালা, ডাক্তার! পরবর্তীতে তৎকালীন বাশার আল-আসাদ সরকার সেই কিশোরদের গ্রেপ্তার করে নির্মম অত্যাচার চালায়। মূলত এই ঘটনাটিই আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে দমনপীড়নের মুখে পড়ে টানা ১৪ বছরের এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয় এবং এতে প্রাণ হারান প্রায় ৫ লাখ মানুষ।

ওই ঘটনার ১৫ বছর পর, দামেস্কের একটি আদালত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও সেই ‘ডাক্তার’ বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে।

গত মঙ্গলবার (১১ জুলাই) দামেস্কের একটি আদালত সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদকে তাঁদের অনুপস্থিতে হত্যা, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। আসাদ পরিবারের দীর্ঘ ৫০ বছরের শাসনের পতনের ২০ মাস পর এটিই আসাদ বা তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের আইনি রায়। তবে এই রায়ের বড় একটি সীমাবদ্ধতা হলো—আসাদ ভাইয়েরা কেউই এখন আর সিরিয়ায় নেই।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর তাঁরা রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। ফলে তাঁদের সিরিয়ায় ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত এই মৃত্যুদণ্ডের রায় কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

আসাদ আমলের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও প্রখ্যাত সিরীয় সাংবাদিক আবদো ফাইয়াজ এনডিটিভিকে বলেন, ‘রায়টি বহুকাল ধরে জমে থাকা এক আক্ষেপের মুক্তি দিয়েছে।’

ফাইয়াজ বলেন, ‘বাশার আল-আসাদ এবং তাঁর শাসনব্যবস্থা সব সময়ই সিরীয়দের প্রধান শত্রু ছিল। তাই যখন শুনি তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তখন এক ধরনের স্বস্তি ও আনন্দ পাই যে, বিচার পেতে যত সময়-ই লাগুক না কেন, অবশেষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আসাদ সরকারের সময় আমরা কতটা ভয় ও যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটিয়েছি তা বাইরের কেউ অনুধাবন করতে পারবে না।

সাংবাদিক ফাইয়াজ আরও বলেন, ‘বাশার আল-আসাদের আমলে আমাদের এখানে একটি প্রচলিত কথা ছিল—কিছু বোলো না, কারণ দেয়ালেরও কান আছে। অর্থাৎ ভুল করে মুখ ফসকে কিছু বলে ফেললে জীবনের শেষ ঠিকানা হতে পারত কারাগার কিংবা মৃত্যু।’ ফাইয়াজের নিজের ভাইও এই নির্যাতনের শিকার হন এবং বিপুল অর্থ ও যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

আসাদ ও তাঁর ভাই ছাড়াও দামেস্ক আদালত আরও ছয় প্রাক্তন কর্মকর্তাকে তাঁদের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে আদালতে উপস্থিত থাকা অবস্থায় একমাত্র যাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনি হলেন আসাদের খালাতো ভাই ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিব। ২০১১ সালে দারা শহরের সেই কিশোরদের নির্যাতনের নেপথ্যে তাঁরই হাত ছিল।

আসাদের পতনের পর কারাগারের দরজা খুলে যায়, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষ রাস্তায় নামে এবং বহু বছর ধরে নির্বাসিত সিরীয়রা দেশে ফিরতে শুরু করেন। তবে আসাদ সরকারের বিদায় হলেও এত দশকের জমে থাকা ভয় ও ক্ষোভ একরাতে মুছে যায়নি।

অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন, নতুন প্রশাসন যেভাবে আসাদ আমলের অনুসারীদের খুঁজছে, তা যেন কোনো প্রতিশোধমূলক রূপ না নেয়। বিশেষ করে সিরিয়ার সংখ্যালঘু আলাউইত সম্প্রদায়ের (আসাদ নিজেও এই সম্প্রদায়ের ছিলেন) মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আসাদের পতনের পর অনেক জায়গায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর আক্রমণ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩৬ বছর বয়সী আলী কোশমর নামের এক বাসিন্দা এনডিটিভিকে জানান, আসাদের পতনের পর তাঁদের গ্রামে সশস্ত্র লোক ঢুকে পড়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করে ও তাঁর ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।

সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক ফাইয়াজ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের পুরোনো সেই অন্ধকার অধ্যায় যেন নতুন কোনো রূপে ফিরে না আসে। ন্যায়বিচার এবং আসাদ ও তাঁর সহযোগীদের জবাবদিহির মাধ্যমেই কেবল সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত