Ajker Patrika

ইরান যুদ্ধ: আরও অনমনীয় তেহরান, লক্ষ্য পূরণে লড়াই চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান যুদ্ধ: আরও অনমনীয় তেহরান, লক্ষ্য পূরণে লড়াই চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র
প্রতীকী ছবি

ইরান হরমুজ প্রণালি খুলতে নারাজ, আর যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ ও চাপের কৌশল থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত এখন এমন এক অচলাবস্থায় আটকে গেছে, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের শর্তকে যুদ্ধ অবসানের পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তেহরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও অবরোধ শেষ, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত এবং গাজা-লেবাননসহ আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। বিপরীতে ওয়াশিংটনও অবরোধ, সামরিক চাপ ও হামলা অব্যাহত রেখে ইরানকে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত সমঝোতায় আনতে চাইছে। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও যুদ্ধ থামার বদলে হরমুজ ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের কিছুক্ষণ পরই ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান তেহরানের অবস্থান নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও ইরান যে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসছে না, তারই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই বলেন, ‘ইরানের বার্তা স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও অবরোধ শেষ না করা পর্যন্ত, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি বন্ধ থাকবে।’ রেজাই এর আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) যুদ্ধকালীন সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান ইরানের আগের নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এবং সদ্য নিয়োগ পাওয়া সামরিক কমান্ডারদের বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবার বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা চালিয়ে যাওয়ার মতো ইচ্ছা ও সক্ষমতা দুটোই তেহরানের রয়েছে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বার্তা

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে প্রথম বৈঠকেই মঙ্গলবার চীনের তেহরানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত কং পেইউয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন রেজাই। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে জোর দেন। জাতিসংঘে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে চীন যে একাত্ম হয়নি, তারও প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার বিষয় থেকে পৃথক।

তবে তেহরান গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে এবং শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো কার্যকর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে, গত রোববার রাতে ওমানের উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো একটি প্রক্ষেপণের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ওই দিনই রেজাইয়ের নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর মঙ্গলবার ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামুদ্রিক হামলাগুলোর একটি চালায়। লোহিত সাগরে মিসরের মালিকানাধীন একটি জাহাজে হামলায় ছয়জন নিহত হন বলে জানিয়েছে হুতিদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।

অবরোধ কার্যকরে মার্কিন হামলা, আক্রান্ত ১২ তম জাহাজ

গত মঙ্গলবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীও একটি হামলার কথা জানায়। তারা বলেছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

এটি এপ্রিল থেকে মার্কিন বাহিনীর হামলার শিকার হওয়া ১২ তম জাহাজ এবং প্রায় এক মাস আগে অবরোধ পুনরায় শুরুর পর তৃতীয় জাহাজ। জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ ভেঙে পড়ার পর এই অবরোধ আবার শুরু হয়। বারবার লঙ্ঘিত হওয়া ওই এমওইউয়ের ৬০ দিনের সময়সীমা আগামী সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যেই পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

তবে গত এক সপ্তাহে তেহরানের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। আইআরজিসি ইঙ্গিত দিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকিকে তারা এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

ইন্টারনেট অবকাঠামোতেও হামলার হুঁশিয়ারি

গতকাল বুধবার আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘ইরানকে আবার হুমকি দেওয়া হলে, লাখ লাখ মাইলজুড়ে বিস্তৃত জ্বালানি পরিবহন লাইন, হাজার হাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র, আমেরিকান ও অ-আমেরিকান সব ব্যবস্থা এবং এমনকি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত বৈশ্বিক অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়বে।’

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি যুদ্ধজাহাজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পারস্য উপসাগরে একটিও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নেই। মোহেববি আরও দাবি করেন, পেন্টাগনের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ‘বড় হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দাবি করেন, যুদ্ধ চলাকালীনও আইআরজিসি আঞ্চলিকভাবে যত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে, তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে মূলত দেশীয় জ্ঞান ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। নাকদি বলেন, ‘যুদ্ধ কয়েক বছর ধরে চললেও আমাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের শত্রুদের ওপর আছড়ে পড়বে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত