Ajker Patrika

ইরানের সঙ্গে চুক্তির আলোচনায় বড় অগ্রগতি, হরমুজে মার্কিন কার্যক্রম স্থগিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ০৮: ৪৩
ইরানের সঙ্গে চুক্তির আলোচনায় বড় অগ্রগতি, হরমুজে মার্কিন কার্যক্রম স্থগিত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযান স্থগিত করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওএ এই তথ্য জানিয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন।

গত সোমবার শুরু হওয়া হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজ বের করে নিয়ে যেতে এই ‘গাইড’ করার অভিযান বা জাহাজ পারাপার কার্যক্রমের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই প্রথম এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে।

এরপর, মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের অনুরোধে...এবং সেই সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে বড় ধরনের অগ্রগতি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পারস্পরিকভাবে একমত হয়েছি যে—অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকলেও প্রজেক্ট ফ্রিডম স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হবে। এর মাধ্যমে দেখা হবে যে চুক্তিটি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা সম্ভব কি না।’

এদিকে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি চার সপ্তাহ পার করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক চাপ অব্যাহত থাকায় এই যুদ্ধবিরতি এখন গুরুতর ঝুঁকির মুখে। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য ভুল-বোঝাবুঝি বা ভুল সিদ্ধান্তও আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

যুদ্ধবিরতির ফলে কূটনৈতিক সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেছিলেন। তবে সেই আলোচনা কোনো ফল ছাড়াই শেষ হয়। পাকিস্তান এখনো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। উভয় পক্ষই চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও, তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়।

এই অচলাবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল হিসাব। ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতিতেই সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং যুদ্ধ তীব্রতর হয়। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে দুটি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানোর যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ইরানের প্রতিক্রিয়া উসকে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন—এটি এখানেই থামবে, নাকি পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

হরমুজ প্রণালি বর্তমানে এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এটি ছিল আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও জানিয়েছেন, আগের অবস্থায় ফেরার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তিশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় হিলিয়াম এবং কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদনেও সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তাহীন দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কঠোর অবস্থান তাঁকে হতাশ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, সহজ বিজয়ের আশা করে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত জটিলতায় ফেলেছে।

অপর দিকে ইরান দেখিয়েছে, তারা সংঘাত আরও বাড়াতে প্রস্তুত। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর—যা হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত এবং তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটি ইরানের নজরে রয়েছে। এর ফলে আমিরাত উদ্বিগ্ন এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে হলে উভয় পক্ষকেই সমঝোতার পথে আসতে হবে। অন্যথায়, একটি ছোট ঘটনা থেকেই আবার বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত