Ajker Patrika

ইরানের রাস্তায় খোলা চুলে হিজাববিরোধী নারীরা—নাখোশ কট্টরপন্থীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানের রাস্তায় খোলা চুলে হিজাববিরোধী নারীরা—নাখোশ কট্টরপন্থীরা
গত ২১ জুলাই ইরানের রাজধানী তেহরানের রাস্তায় এভাবেই খোলা চুলে রাস্তা পার হতে দেখা গেছে এক নারীকে। ছবি: এএফপি

যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের মধ্যেই ইরানে আবারও সামনে এসেছে নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করার প্রশ্ন। দেশটির রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জোরদার করলেও বহু নারী এখন প্রকাশ্যেই সেই বিধিনিষেধ অমান্য করছেন। তবে ব্যাপক গণ অসন্তোষের আশঙ্কায় সরকার আপাতত বড় ধরনের দমনাভিযান শুরু করতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) সিএনএন জানিয়েছে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় সরকারপন্থী সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও অনেক নারীকে মাথা অনাবৃত অবস্থায় দেখা গেছে। সে সময় সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ আরও বড় সংকট ছিল।

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাববিধি অমান্যকারী ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার খবর বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, গত ১৯ জুলাই তেহরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কার্যকর না করায় অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তেহরানের প্রসিকিউটর কার্যালয়ও সম্প্রতি ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং ‘অপ্রচলিত’ বা অনুপযুক্ত পোশাক বিক্রি করা দোকানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশেও ‘সামাজিক রীতি’ ও বাধ্যতামূলক হিজাববিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি।

চার বছর আগে পুলিশ হেফাজতে তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনটি কঠোরভাবে দমন করা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে হিজাব বাধ্যতামূলক করার আইন অমান্যের প্রবণতা এখনো ব্যাপক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে তরুণীরা স্কুটার চালাচ্ছেন—মাথায় হেলমেট থাকলেও অনেকের মাথায় নেই হিজাব। ইসফাহান ও শিরাজেও নারী মোটরসাইকেল আরোহীদের দলবদ্ধভাবে রাস্তায় চলাচলের ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে।

এদিকে কট্টরপন্থীরা হিজাববিরোধী অবস্থানকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, পশ্চিমা শক্তি ও ইসরায়েল ইরানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দুর্বল করতে নারীদের পোশাককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

তবে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ভিন্ন অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এক রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতার হিজাব সংক্রান্ত মন্তব্যের জবাবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আইন ও জোর করে কি মানুষের আচরণ বা বিশ্বাস পরিবর্তন করা সম্ভব?

তিনি বলেন, আচরণ পরিবর্তন মূলত সাংস্কৃতিক ও বিশ্বাসের বিষয়; বলপ্রয়োগ করে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করা যায় না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের হিজাব পরার ওপর ধীরে ধীরে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। দেশটির ইসলামি দণ্ডবিধির ৬৩৮ ধারায় হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ‘ইসলামি হিজাব’-এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সেখানে নেই।

বর্তমানে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত ইরানে হিজাব প্রশ্নটি তাই আবারও রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। কট্টরপন্থীদের চাপ বাড়লেও প্রকাশ্যে হিজাববিরোধী নারীদের দৃঢ় অবস্থান সরকারকে কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত