Ajker Patrika

বেঙ্গালুরুতে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ বিরুদ্ধে অভিযানে হয়রানি–মারধরের শিকার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বেঙ্গালুরুতে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ বিরুদ্ধে অভিযানে হয়রানি–মারধরের শিকার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা
প্রতীকী ছবি

পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেঙ্গালুরুতে কাজের খোঁজে আসা ভারতীয়দের অনেকেই এখন নিজেদেরই নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে পুলিশের হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করছেন। তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে বারবার আটক, মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগে আতঙ্কে কেউ পরিবার নিয়ে শহর ছাড়ছেন, আবার কেউ দিনের পর দিন সঙ্গে রাখছেন নিজের নাগরিকত্বের নথিপত্রের কপি। এমনকি যাঁরা একসময় বাংলাদেশি শনাক্ত করতে পুলিশের সঙ্গে কাজ করতেন, তাঁদেরও এখন একই অভিযোগে আটক করা হচ্ছে।

মুরশিদার স্বামীকে বারবার আটক করা হতো। পুলিশ তাঁকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ অভিবাসী মনে করে মারধরও করেছে বলেও অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত চার মাস আগে পরিবারকে বেঙ্গালুরুতে রেখে নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন তিনি।

মুরশিদার প্রশ্ন, ‘আমরা তো ভারতীয়। তাহলে এভাবে পালিয়ে বেড়াতে হবে কেন? আমরা কী করেছি যে আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে?’ মুরশিদা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেঙ্গালুরুতে আসা এমন অনেক অভিবাসীর একজন, যারা বলছেন—পুলিশ তাদের বারবার আটক করছে এবং হয়রানি করছে।

মুরশিদা বলেন, ‘আমার স্বামী যখন বলল, সে চলে যাবে, তখন আমার সাত বছরের মেয়ে কাঁদতে শুরু করে। তাই মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে যায় সে। কয়েক মাস ধরে আমি আমার স্বামী ও মেয়েকে দেখিনি।’ এ সময় তিনি তাঁর স্বামীর পূরণ করা একটি গণনাপত্রের (এনুমারেশন ফর্ম) কপি দেখান। কর্ণাটকে চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় সম্প্রতি তিনি এই ফর্মটি পূরণ করেছেন।

মুরশিদা বলেন, ‘ফর্মটিতে দেখা যাচ্ছে, সে এখানকার নাগরিক।’ তাঁর স্বামী বেঙ্গালুরুতেই এই গণনাপত্র পেয়েছেন। কারণ, তিনি বহু বছর ধরে সেখানে ভোট দিয়ে আসছেন। অন্যদিকে, মুরশিদার নিজের ভোটার আইডি রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী শহরে। তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাদের ভয় দেখাচ্ছিল যে, সে নাগরিক না হওয়ায় এখানে ফর্ম পাবে না। কিন্তু যখন সে ফর্মটি পেল, সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফোন করে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা বা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য তার বাবা-মায়ের তথ্য চাইল। এরপর ফর্মটি পূরণ করে জমা দেয়।’

তবে এখন সেই ফর্মই পরিবারের জন্য নতুন করে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর স্বামীর বিভিন্ন নথিতে নাম ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে মিল নেই। এই অসঙ্গতিগুলো আবারও তাঁকে পুলিশের হয়রানির মুখে ফেলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

নথিপত্র প্রস্তুত রাখেন

মুরশিদা একটি মোটা ফাইলভর্তি ফটোকপি দেখিয়ে বলেন, ‘পুলিশ যখনই আমাদের আটক করে, তখন দেখানোর জন্য আমরা নথিগুলোর কপি প্রস্তুত রাখি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন করা হবে? আমরা কী করেছি?’

মুরশিদা ২০০৮ সাল থেকে স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বেঙ্গালুরুতে বসবাস করছেন। প্রথমে তিনি ইলেকট্রনিক্স সিটির একটি অ্যাপার্টমেন্টে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পরে রান্নার কাজ শুরু করেন। গত বছর আবার গর্ভবতী হওয়ার পর তিনি কাজ ছেড়ে দেন এবং স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন। এখন স্বামীও চলে গেছেন।

মুরশিদা বলেন, ‘সে ভিডিও কলে কথা বলে এবং মেয়েকে দেখায়। কিন্তু সে সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকে। আমি প্রতিদিন তাঁকে ফিরে আসতে বলি। কিন্তু সে বলে, আর এই ধরনের আচরণ সহ্য করতে পারছে না।’ তিনি জানান, চলতি বছর ঈদের সময় থেকেই এই সমস্যার শুরু। পশ্চিমবঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করে পরিবারটি যখন বেঙ্গালুরুতে ফিরে আসে, তখন কেউ পুলিশকে জানায় যে ‘ট্রেনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি আসছে।’ এ সময় বেঙ্গালুরুর ম্যাজেস্টিক রেলওয়ে স্টেশনে অভিবাসীদের আসার একটি ভিডিও ক্লিপও পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।

মুরশিদা বলেন, ‘এরপর পুলিশ আমাদের আটক করে। কয়েক দিন পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।’

শুধু মুরশিদা নন

মোহাম্মদ শেখ ও আমিনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে। গত বছর পর্যন্ত তারা ‘বাংলাদেশি’ শনাক্ত করার অভিযানে পুলিশের সঙ্গে কাজ করতেন। এখন তাদেরই বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বেঙ্গালুরুর ভূপাসান্দ্রায় ভাঙারি সংগ্রহের কাজ করেন মোহাম্মদ শেখ। তিনি দাবি করেন, ‘কথাবার্তার টান ও ব্যবহৃত শব্দ শুনেই আমরা বুঝতে পারি কে মূলত বাংলার মানুষ আর কে নয়। আমরা জানতাম এসব মানুষ কোথায় থাকেন এবং তাদের সম্পর্কে পুলিশকে তথ্যও দিতাম। অথচ এখন তারাই আমাদের ‘বাংলাদেশি’ বানিয়ে দিচ্ছে।’

মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশিরা কোথায় থাকে, পুলিশ তা জানে। কিন্তু আমাদের সহজ লক্ষ্য বানানো হয়েছে। তারা আমাদের ধরে নিয়ে যায়, মারধর করে এবং অনেক সময় শহরের মাঝখানে ছেড়ে দেয়।’ তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা যে এলাকায় থাকি, সেখানে ফিরে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আমরা স্থানীয় ভাষা জানি না, শহরের রাস্তাঘাটও চিনি না। এমনকি একা বের হওয়াও বন্ধ করে দিয়েছি। সাধারণত কর্মস্থলের জায়গাগুলোতেই দলবদ্ধভাবে থাকি।’

একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে মোহাম্মদ জানান, একবার তাকে মারধর করে শান্তিনগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

মোহাম্মদ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেঙ্গালুরুতে আসা অভিবাসী। অন্যদিকে ৪৩ বছর বয়সী আমিন বেঙ্গালুরুতেই জন্মেছেন এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে চিক্কাবাল্লাপুরে বসবাস করছে। কয়েক মাস আগে আমিন ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) এবং নগর পুলিশের কাছে একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি অভিবাসীরা কোথায় থাকেন, সেই তথ্য দেন।

কিন্তু আমিনের দাবি, পুলিশ ওই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে উল্টো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তারা জানতে চায়, তিনি কীভাবে এসব বাংলাদেশিকে চেনেন এবং তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ বা সম্পর্ক আছে কি না।

অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের

তবে হয়রানির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বেঙ্গালুরু সিটি পুলিশের কমিশনার সীমান্ত কুমার সিং। তিনি বলেন, ‘সব গ্রেপ্তারই পুলিশের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। কোনো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে ভুলভাবে ফাঁসানো বা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রশ্নই ওঠে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত