Ajker Patrika

লেবাননে হিজবুল্লাহর পেছনে শারার সিরিয়াকে লেলিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্পের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
লেবাননে হিজবুল্লাহর পেছনে শারার সিরিয়াকে লেলিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চেয়েছিলেন—সিরিয়া লেবাননে প্রবেশ করে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাক। তাঁর দাবি, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনী এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের তুলনায় আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারত। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

ফ্রান্সের এভিয়ঁ–লে–বঁ শহরে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি–৭ সম্মেলনের ফাঁকে কাতারের শাসকের পাশে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েল অনেক দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়ছে এবং অনেক মানুষ নিহত হচ্ছে। আমি ইসরায়েলকে বলেছিলাম, হিজবুল্লাহর বিষয়টি সিরিয়াকে সামলাতে দিতে।’

আহমেদ আল-শারার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি খুবই সক্ষম।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যদি ইসরায়েল কাজটা করতে না পারে, সবাইকে হত্যা না করে, তাহলে সে করবে। সিরিয়া করবে।’ চলতি মাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে দামেস্কের হস্তক্ষেপের ধারণা তুলে ধরলেন। তবে এমন পদক্ষেপ অতীতের সংবেদনশীল ইতিহাসকে আবারও সামনে নিয়ে আসতে পারে। কারণ ১৯৭৬ সালে সিরিয়া লেবাননে আক্রমণ চালিয়েছিল এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশটির একটি অংশে কার্যত নিয়ন্ত্রণ বা উপস্থিতি বজায় রেখেছিল।

এর আগে, গত ৭ জুন ট্রাম্প বলেছিলেন, শারা ‘লেবাননে সাহায্য করতে চাইবেন হয়তো।’ সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একাধিকবার শারার প্রশংসা করেছেন। তাঁকে তিনি ‘খুব শক্তিশালী নেতা’ এবং ‘কঠিন মানুষ’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাঁর প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

যুক্তরাষ্ট্রের তুরস্কে রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক দূত টম বারাক মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে লেবাননে প্রবেশের জন্য চাপ দিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রথম জানায়, ওয়াশিংটন সিরিয়াকে পূর্ব লেবাননে সেনা পাঠিয়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে ভূমিকা রাখতে চাপ প্রয়োগ করছে।

সতর্ক অবস্থানে দামেস্ক

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পূর্ব লেবাননে সিরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদন দিয়েছে এবং দামেস্ক সরকার বিষয়টি ‘সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছে।’ তবে শারা প্রশাসনের আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপ নিলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সিরিয়ার শিয়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে আলভি, দ্রুজ ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিস্ফোরণও দেখা গেছে।

৪৩ বছর বয়সী আহমেদ আল-শারা ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সেখানে যান। পরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করে এবং তিনি প্রায় পাঁচ বছর মার্কিন কারাগারে ছিলেন। পরে তিনি আল-কায়েদার সিরীয় শাখা আল-নুসরা ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া সরকারের অনুগত বাহিনী লেবাননে মোতায়েন করা হলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে। ইসরায়েলের হামলায় ইতোমধ্যে সেই উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

শারার রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনভিত্তির একটি অংশ সালাফি যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত। সালাফিরা সুন্নি ইসলামের এমন একটি ধারা অনুসরণ করে, যারা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের ঐতিহ্যকে আক্ষরিকভাবে অনুসরণের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ লেবাননের সবচেয়ে বড় শিয়া রাজনৈতিক শক্তি। এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সংগঠন এবং আধাসামরিক বাহিনী, যারা ইরানের সমর্থন পেয়ে এসেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে হিজবুল্লাহ সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল।

আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আসাদ সরকারকে উৎখাত করে। শারাকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘হিজবুল্লাহর বিষয়ে সে খুব ভালো। সে তাদের পছন্দ করে না।’ বে শারা সরকার জানিয়েছে, লেবাননে সেনা পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়া বর্তমানে পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ কাজে বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার সহায়তা করছে।

এদিকে দেশের দক্ষিণ সীমান্তেও শারা প্রশাসন নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি। আসাদের পতনের পর ইসরায়েল দক্ষিণ সিরিয়ায় জাতিসংঘের বাফার জোনে অবস্থান নেয় এবং গত গ্রীষ্মে রাজধানী দামেস্ক পর্যন্ত পৌঁছানো শক্তিশালী বিমান হামলা চালায়। বর্তমানে ইসরায়েল সিরিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট হারমন এলাকায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।

এ ছাড়া, বিশেষজ্ঞদের মতে, সিরিয়ার দ্রুজ সংখ্যালঘুদের রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করারও চেষ্টা করছে ইসরায়েল। এ উদ্দেশ্যে দ্রুজ নেতা শেখ হিকমত সালামান আল-হাজরিকে অস্ত্র সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত