Ajker Patrika

ইরানে গোপনে হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরবও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৯: ১৩
ইরানে গোপনে হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরবও
ছবি: এএফপি

যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরবে হওয়া হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরানকে লক্ষ্য করে অসংখ্য গোপন হামলা চালিয়েছে রিয়াদ। দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা ও দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে গোপনে হামলা চালিয়েছিল।

সৌদি আরবের এই হামলাগুলো সম্পর্কে এর আগে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জানা গেল, সৌদি আরব ইরানের মাটিতে সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি বিমানবাহিনী এই হামলাগুলো গত মার্চের শেষ দিকে চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে একজন বলেন, এগুলো ছিল ‘সৌদি আরবে হামলার বিপরীতে সমানুপাতিক প্রতিশোধমূলক হামলা।’

রয়টার্স স্বাধীনভাবে হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক থাকা সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবেই মার্কিন সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। তবে ১০ সপ্তাহব্যাপী এই যুদ্ধে রিয়াদ এমন কিছু হামলার শিকার হয়েছে, যা মার্কিন সামরিক ছত্রচ্ছায়া ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।

পাল্টা আঘাত শুরু করেছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো

সৌদি আরবের এই হামলাগুলো সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এমনভাবে গ্রাস করেছে, যা প্রকাশ্যে খুব একটা স্বীকার করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পর থেকে ইরান মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশেই আঘাত হানে। তারা কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেই নয়, বরং বেসামরিক এলাকা, বিমানবন্দর এবং তেল শোধনাগারেও হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায়।

গত সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছে। সৌদি ও আমিরাতের এই পদক্ষেপ একটি প্রচ্ছন্ন সংঘাতের চিত্র ফুটিয়ে তোলে—যেখানে ইরানি হামলায় জর্জরিত উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো পাল্টা আঘাত করা শুরু করেছে। তবে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ইরানের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যেখানে তেহরানের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনৈতিক তৎপরতায় খুব একটা জড়াচ্ছে না তারা।

অন্যদিকে, সৌদি আরব সংঘাত যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই চেষ্টা করেছে এবং রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। অবশ্য ইরানি রাষ্ট্রদূত এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইরানের সঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘ডি-এস্কেলেশন’ বা উত্তেজনা প্রশমন চুক্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদি আরবের অবিচল অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করছি, যা এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির স্বার্থে উত্তেজনা হ্রাস এবং ধৈর্য ধারণকে সমর্থন করে।’

আগে হামলা, পরে উত্তেজনা প্রশমন

ইরানি এবং পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরব তাদের হামলার বিষয়ে ইরানকে অবহিত করেছিল। এরপর শুরু হয় নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আরও হামলার হুমকি। এর ফলে দুই দেশ উত্তেজনা প্রশমনে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়। থিঙ্কট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, সৌদি আরবের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং এরপর দুই দেশের সমঝোতা এটাই প্রমাণ করে, ‘উভয় পক্ষই খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে যে অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।’

আলী ভায়েজ আরও বলেন, ‘এই ঘটনাক্রম এটাই দেখায়, এখানে বিশ্বাস কাজ না করলেও একটি সাধারণ স্বার্থ কাজ করছে, যাতে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সংঘাতের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যায়।’

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে গত ৭ এপ্রিল যখন বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, তার আগের সপ্তাহেই সৌদি-ইরান এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হয়েছিল। হোয়াইট হাউস এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এক ইরানি কর্মকর্তা তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল শত্রুতা বন্ধ করা, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং সংঘাতের বিস্তার রোধ করা।’

দীর্ঘদিন ধরে বৈরী অবস্থানে থাকা ইরান ও সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে যথাক্রমে শিয়া এবং সুন্নি মুসলিমদের নেতৃত্বদানকারী শক্তি। চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। এর ফলে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি এবং সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিরতিও বজায় রয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকায় সৌদি আরব যুদ্ধের মধ্যেও তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পেরেছে এবং অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত