Ajker Patrika

ট্রাম্পের বন্ধুর বিমানে করে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ট্রাম্পের বন্ধুর বিমানে করে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে
ইসরায়েলি বিমানবন্দরে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরানো ফিলিস্তিনিরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সকালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরের একটি চেকপয়েন্টে আট ফিলিস্তিনি পুরুষকে নামিয়ে দেয়। সে সময় তাঁর ছিলেন বিভ্রান্ত, কাঁপছিলেন ঠান্ডায়। গায়ে ছিল কারাগারে দেওয়া ট্র্যাকস্যুট, হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে সামান্য কিছু জিনিসপত্র।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তারা বসেছিলেন একটি ব্যক্তিগত জেট বিমানের নরম চামড়ার গদিমোড়া আসনে। তখন তাদের কবজি ও পা শিকলে বাঁধা ছিল। বিমানটি ফ্লোরিডার রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী গিল ডেজারের। ডেজার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার, দাতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বন্ধু। তিনি মায়ামির ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস’-এর সদস্যও।

ডেজারের গালফস্ট্রিম জেট, যেটিকে তিনি ‘ছোট রকেট’ বলে ডাকেন, ব্যবহার করা হয়েছিল ফিলিস্তিনি ওই পুরুষদের পরিবহনের জন্য। বিমানটি অ্যারিজোনার একটি রিমুভাল সেন্টারের কাছের বিমানবন্দর থেকে তেল আবিবে যায়। পথে এটি নিউ জার্সি, আয়ারল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ায় জ্বালানি নেয়। এসব রিমুভাল সেন্টার মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন পুলিশের (আইসিই) অস্থায়ী আটক কেন্দ্র।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফ্লাইটটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গোপন ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অভিযানের অংশ। আইসিই কর্তৃক গ্রেপ্তার ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে পাঠানো হয়েছিল। ২১ জানুয়ারির ফ্লাইটের যাত্রী মাহের আওয়াদের বয়স ২৪ বছর। তিনি পশ্চিম তীরের বাসিন্দা। তিনি প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।

পশ্চিম তীরের রাম্মুন শহরে দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তাঁর মিশিগানে থাকা বান্ধবী ও সদ্যোজাত সন্তানের ছবি দেখান। মাহের বলেন, ‘আমি আমেরিকায় বড় হয়েছি। আমেরিকা ছিল আমার জন্য স্বর্গ।’

সেই সপ্তাহের সোমবার ডেজারের জেট আবার ব্যবহার করা হয়। আরও একটি ফিলিস্তিনি গ্রুপকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নামানো হয়। তাদেরও পশ্চিম তীরে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও অভিবাসন আইনজীবীরা বলেছেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের গণ-নির্বাসন অভিযানের নীতিগত পরিবর্তনের অংশ।

ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ জানায়, বিমানবন্দরে পৌঁছালে পুরুষদের ঘিরে রাখে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর সশস্ত্র প্রহরীরা তাদের পশ্চিম তীরের নি’লিন গ্রামের কাছে একটি চেকপয়েন্টে নিয়ে যায়। মাহের বলেন, “ওরা আমাদের রাস্তার পাশে পশুর মতো ফেলে দেয়। আমরা পাশের বাড়িতে যাই। দরজায় কড়া নাড়ি। বলি, দয়া করে সাহায্য করুন। ”

চেকপয়েন্টের কাছেই থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ কানান। তিনি বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম। তারা আমার বাড়ি ও গ্রামের দিকে হাঁটছিল। সাধারণত সেনাবাহিনী এই চেকপয়েন্টে বন্দী ছাড়ে না।’ তারা মাত্র দুই ঘণ্টা কানানের বাড়িতে থাকে। এই সময় তাদের খাওয়ানো হয় এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়।

আইসিইর ব্যবহার করা ব্যক্তিগত জেটের লেজে রয়েছে ডেজার ডেভেলপমেন্টের লোগো। কোম্পানিটি গড়ে তোলেন মাইকেল ডেজার। বর্তমানে পরিচালনা করেন তার ছেলে গিল ডেজার। ডেজারের পরিবার প্রথম ট্রাম্পের সঙ্গে ২০০০ দশকের শুরুতে ব্যবসায়িক অংশীদার হয়। মায়ামিতে তারা ছয়টি ট্রাম্প-ব্র্যান্ডেড আবাসিক টাওয়ার নির্মাণ করে। বাবা ও ছেলে মিলে ১৩ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট প্রচারে।

গিল ডেজার মায়ামির বিলাসবহুল সম্পত্তি জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তি। গত বছর তাঁর ৫০ তম জন্মদিনে উপস্থিত ছিলেন বহু তারকা। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধু। এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি তার বিয়েতে ছিলাম। সে আমার বিয়েতে ছিল। আমরা ভালো বন্ধু। তিনি (প্রেসিডেন্ট হিসেবে) অফিসে থাকায় গর্বিত।’

ডেজারের বিমান আইসিই ভাড়া করেছিল ফ্লোরিডাভিত্তিক জার্নি অ্যাভিয়েশনের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি ফ্লাইট নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ফার্স্ট জানিয়েছে, ডেজারের জেট একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার অংশ। এটি ব্যক্তিগত বিমান ব্যবহার করে গণ-নির্বাসন অভিযান চালাচ্ছে, যেখানে ন্যায্য প্রক্রিয়া উপেক্ষিত, পরিবার বিচ্ছিন্ন এবং জবাবদিহি নেই।

গত ২১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারির ফ্লাইটে আয়ারল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় জ্বালানি নেওয়া হয়। এ নিয়ে ওই দেশগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে যাত্রীদের আইনি অবস্থান প্রশ্ন তুলতে পারে। ২১ জানুয়ারির ফ্লাইটে আটজন ফিলিস্তিনির পায়ে শিকল ছিল। মাহের ও সামির ইসম আজিজ জেইদান জানান, তাঁরা শরীর ও কবজি বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। খাবার খাওয়া কঠিন ছিল।

জেইদানের চাচা বলেন, ‘এখন সে আর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারবে না। তার পুরো পরিবার সেখানে।’ মাহেররও যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার রয়েছে, যার মধ্যে চার মাস বয়সী ছেলে রয়েছে। মাহের বলেন, ‘আমি ১৫ বছর বয়সে পশ্চিম তীর ছাড়ি। একাই যুক্তরাষ্ট্রে আসি। আমার জীবন, অভিজ্ঞতা সবই সেখানে। এখন আমি এখানে থাকতে চাই না। যত দ্রুত সম্ভব ফিরে যেতে চাই।’ মিশিগানে থাকা মাহেরের বান্ধবী স্যান্ড্রা ম্যাকমাইলার বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই। সে তাঁর সন্তানকে কোলে নিতে চায়, চুমু দিতে চায়, সবকিছু করতে চায়।’

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র বলেন, ‘যদি কোনো বিচারক সিদ্ধান্ত দেন, কোনো অবৈধ অভিবাসীর এই দেশে থাকার অধিকার নেই, আমরা তাকে সরিয়ে দেব। এটিই চূড়ান্ত।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই অভিযানে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত