Ajker Patrika

তেল ছাড়া ভেনেজুয়েলার আর কী কী সম্পদ রয়েছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
তেলের বাইরেও ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন খনিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সোনাসহ বিপুল সম্পদ। ছবি: সংগৃহীত
তেলের বাইরেও ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন খনিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সোনাসহ বিপুল সম্পদ। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত—এই পরিচয়েই সাধারণত ভেনেজুয়েলাকে চেনে সবাই। কিন্তু তেলের বাইরেও দেশটির মাটির নিচে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল সম্পদ। খনিজ, প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা—সব মিলিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানায়, তারা দ্রুত দেশটির তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধার করতে ও খনিশিল্প সম্প্রসারণ করতে চায়।

গত রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপনাদের আছে ইস্পাত, আছে খনিজ—সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। ভেনেজুয়েলার খনিশিল্পের ইতিহাস সমৃদ্ধ, কিন্তু তা জং ধরে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটি ঠিক করবেন এবং আবার ফিরিয়ে আনবেন।’

তেলের বাইরে ভেনেজুয়েলার সম্পদগুলো আসলে কী

ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় শক্তি তেল। ২০২৩ সালের হিসাবে দেশটির প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল—যা যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের (৫৫.২৫ বিলিয়ন ব্যারেল) চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি।

ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাগদাদে ইরান, ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটি ওপেক গঠন করে।

দেশটির তেলভান্ডারের বড় অংশ অবস্থিত পূর্ব ভেনেজুয়েলার বিশাল অরিনোকো বেল্টে। প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেত্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলার (পিডিভিএসএ) নিয়ন্ত্রণে।

অরিনোকো বেল্টের তেল অত্যন্ত ভারী ও ঘন। এ ধরনের অতি ভারী অপরিশোধিত তেল তুলতে খরচ বেশি এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেলের মতো হালকা তেলের তুলনায় এটি সাধারণত কম দামে বিক্রি হয়। এই তেল পরিশোধনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি দরকার, যা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও লুইজিয়ানার শোধনাগারগুলোতে রয়েছে।

কে কিনছে ভেনেজুয়েলার তেল

একসময় ভেনেজুয়েলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ ও দুই হাজারের শুরুর দিকে দেশটি প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করত।

কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, পিডিভিএসএতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

ওপেকের কাছে জমা দেওয়া পিডিভিএসএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৫২ হাজার ব্যারেল, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেল। রয়টার্সের হিসাবে, ২০২৪ সালে বিদেশে তেল বিক্রি করে দেশটি আয় করেছে ১৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।

গত এক দশক ধরে ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে—ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ শুরুর আগে—ভেনেজুয়েলা দৈনিক ৯ লাখ ৫২ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। এর মধ্যে ৭ লাখ ৭৮ হাজার ব্যারেল যায় চীনে, যা মোট রপ্তানির ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা—ভেনেজুয়েলার তেলের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ যায় সেখানে। এরপর রয়েছে কিউবা, যেখানে ভেনেজুয়েলা প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ তেল রপ্তানি করে।

প্রাকৃতিক গ্যাসেও শক্ত অবস্থান

প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে বিশ্বে ভেনেজুয়েলার অবস্থান নবম। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির গ্যাস মজুত ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার, যা দক্ষিণ আমেরিকার মোট গ্যাস মজুতের ৭৩ শতাংশ।

এই গ্যাসের বড় অংশই তেলের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তেল উত্তোলনের পার্শ্বপণ্য হিসেবে।

লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্বর্ণভান্ডার

ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা সোনার পরিমাণ লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সরকারি স্বর্ণভান্ডার প্রায় ১৬১ দশমিক ২ টন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভেনেজুয়েলার অনাবিষ্কৃত স্বর্ণসম্পদ আরও অনেক বেশি।

২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ অরিনোকো মাইনিং আর্ক ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ছিল ধাতু অনুসন্ধান, জাতীয়করণ ও রপ্তানি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এই প্রকল্প আরও সম্প্রসারণ করেন। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ এলাকা খনিশিল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়। সরকার জানায়, এখানে হীরা, নিকেল, কোলটান ও তামার মজুত রয়েছে।

২০১৮ সালে মাদুরো ‘গোল্ড প্ল্যান’ ঘোষণা করেন। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের খনিচুক্তি সই হলেও বাস্তবে সেগুলোর কোনোটিই কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ খনি এখনো রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।

একই বছর ভেনেজুয়েলার পরিবেশগত খনি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে অন্তত ৬৪৪ টন সোনা রয়েছে। তবে সরকারের মতে, প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় আর কী খনিজ আছে

২০১৮ সালের খনিজের তালিকা অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে—প্রায় ৩ বিলিয়ন টন প্রমাণিত কয়লার মজুত; ১৪ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন টন লৌহ আকরিক, যার মধ্যে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন টন চিহ্নিত করা; ৪ লাখ ৭ হাজার ৮৮৫ টন নিকেল; ৯৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন বক্সাইট; অরিনোকো মাইনিং আর্কে ১ হাজার ২০ মিলিয়ন ক্যারেট হীরা, এর মধ্যে শুধু গুয়ানাইমো এলাকায়ই ২৭৫ মিলিয়ন ক্যারেট হীরার মজুত রয়েছে।

আল-জাজিরা থেকে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে সড়কপথে জয়শঙ্করের ৪০০ মাইলের রুদ্ধশ্বাস যাত্রা, নেপথ্য কাহিনি

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: মূল নকশার বাইরে চারটি র‍্যাম্প নির্মাণের ভাবনা

ওয়াশিংটন সফরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, যা আলোচনা হলো মার্কিনদের সঙ্গে

আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই: ট্রাম্প

অধিবাসীদের নগদ অর্থ দিয়ে গ্রিনল্যান্ড ‘কেনার’ কথা ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত