Ajker Patrika

৪৭ বছরের মধ্যে প্রথম: অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রিত্বের পথে বিজয়, বদলে দিচ্ছেন তামিলনাড়ুর রাজনীতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ১৭: ১৬
৪৭ বছরের মধ্যে প্রথম: অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রিত্বের পথে বিজয়, বদলে দিচ্ছেন তামিলনাড়ুর রাজনীতি
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে থালাপতি বিজয় যদি তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে জিততে পারেন, তবে তিনি এমন এক ইতিহাস গড়বেন যা গত ৪৯ বছরেও কোনো চলচ্চিত্র তারকা পারেননি। এমজি রামচন্দ্রনের পর বিজয়ই হবে অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া প্রথম ব্যক্তি। চন্দ্রশেখর ১৯৭৭ সালে তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে নতুন করে গড়ে দিয়েছিলেন।

এমজি রামচন্দ্রন ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঝড় তোলেন এবং ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক দশক তামিলনাড়ু শাসন করেন। তিনি ভক্তদের আবেগকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক যন্ত্রে রূপ দেন, কল্যাণনীতিকে ভোটারদের সঙ্গে আবেগীয় চুক্তিতে পরিণত করেন এবং ব্যক্তিত্ব ও নীতির সংযোগকে স্থায়ীভাবে বদলে দেন।

এরপর আর কোনো অভিনেতা সেই চূড়ান্ত নির্বাচনী সীমা অতিক্রম করতে পারেননি, যদিও একাধিক প্রচেষ্টা এবং বিপুল ভক্তসমর্থন ছিল। জয়ললিতা নিজেও বড় মাপের চলচ্চিত্র তারকা হয়েও মুখ্যমন্ত্রীর আসনে পৌঁছান এমজিআরের গড়া এআইএডিএমকে উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করে, সেটিকে শক্তিশালী করে এবং শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে। নিজস্ব নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নয়।

কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রবণতা বলছে, বিজয়ের তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) মাত্র দুই বছর পুরোনো দল হলেও তারা প্রায় ১০০–১১৮ আসনে এগিয়ে আছে। দলটি যদি এই সংখ্যার মধ্যেও কোনো আসন পায় তবুও তারা রাজ্যের শীর্ষ দল হিসেবেই থাকবে।

বিজয় তাঁর ভক্তদের ভিত্তিকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন ২০০৯ সালে। সে সময় রাজ্যজুড়ে বিজয় তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলোকে সংগঠিত করে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের রূপ দেন। প্রথমদিকে এটি ছিল কল্যাণ ও সেবামূলক নেটওয়ার্ক, কিন্তু ধীরে ধীরে ত্রাণকাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে বুথ পর্যায়ে পরিচিতি তৈরি করে।

এরপর, ২০১১ সালের বিধানসভায় এই প্ল্যাটফর্ম প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়। এটি ছিল বিজয়ের প্রথম সরাসরি নির্বাচনী অবস্থান এবং একটি পরীক্ষা—তারকাখ্যাতি ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে কি না। এরপর, ২০১০-এর দশকের শেষভাগ এবং ২০২০-এর শুরুর দিকে বিজয়ের চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক উপস্থিতিতে ক্রমশ রাজনৈতিক সুর বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএন) সমালোচনা তাঁর সিনেমার বাইরেও অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অডিও লঞ্চ, ফ্যান মিটিং এবং দাতব্য অনুষ্ঠানে ক্রমশ উঠে আসে পরীক্ষা-চাপ, যুব বেকারত্ব, দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়। এগুলো প্রথমবার ভোটার এবং শহুরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের সঙ্গে সুর মেলায়। দল গঠনের আগেই সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের প্রার্থীরা তারা যে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তার বেশিরভাগই জিতে নেয়। এতে প্রমাণ হয়, এই নেটওয়ার্ক শুধু জনসমাগম নয়, ভোটও টানতে পারে।

অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় যখন তামিলাগা ভেত্ত্রি কাজাগম গঠন করেন, তখন তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। টিভিকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এককভাবে লড়বে, আগাম জোট প্রত্যাখ্যান করবে এবং নিজেকে ডিএমকে-এআইএডিএমকের দ্বৈত আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করবে—এই বার্তাই দিয়েছিলেন তিনি।

এরপর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসর ঘোষণা করেন। প্রায় ৭০টি ছবির তিন দশকের ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার—এটি কোনো পার্শ্ব প্রকল্প নয়। পরের দুই বছরে টিভিকে একটি ভক্তভিত্তিক কাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ দলে রূপ দেয়। জেলা কমিটি, বিধানসভা ইউনিট, বুথ পর্যায়ের সংগঠন গড়ে তোলে। একই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য শাণিত করে।

বিজয়কে ঐতিহ্যগত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তা হিসেবে নয়, বরং একজন শ্রোতা হিসেবে তুলে ধরা হয়—যেখানে সামাজিক মাধ্যমের টাউন হল এবং নিয়ন্ত্রিত জনসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পথচলা বাধাহীন ছিল না। ২০২৫ সালে কারুরে টিভিকের এক জনসভায় প্রাণঘাতী পদদলনের ঘটনা বিজয়কে প্রথম বড় রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তাঁর প্রতিক্রিয়া—সংযত, প্রকাশ্য এবং সংশোধনমূলক—ভবিষ্যতে বড় পরিসরের শাসন সংকট কীভাবে সামলাতে পারেন, তার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়। এখন পরিসংখ্যান বলছে, এই ঝুঁকি নেওয়া কাজ করেছে। পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, প্রায় ১১০ আসন পেলে বিজয় সরকার গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবেন—মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বা অন্তত অপরিহার্য শক্তি হিসেবে। আগাম জোট প্রত্যাখ্যানের কারণে, নির্বাচনের পর যেকোনো সমঝোতা তাঁর অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে তীব্র নজর থাকবে।

গঠনগত দিক থেকে পরিবর্তন ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। টিভিকে যখন ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট এবং দুর্বল হলেও উপস্থিত এআইএডিএমকের পাশাপাশি শক্তিশালী মেরু হিসেবে উঠে আসছে, তখন তামিলনাড়ু এমন এক ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে, যা এমজিআরের উত্থানের পরবর্তী সময়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ছোট দলগুলো, যারা এতদিন দুই দ্রাবিড় শক্তির একটির সঙ্গে জোটে নির্ভরশীল ছিল, এখন একটি তৃতীয় কেন্দ্র দেখতে পাচ্ছে।

এমজিআরের সঙ্গে বিজয়ের তুলনা অনিবার্য, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ নয়। এমজিআর যেখানে নাটকীয় বিভাজন এবং কল্যাণভিত্তিক জনতাবাদের ঢেউয়ে ভেসে উঠেছিলেন, বিজয়ের আকর্ষণ সেখানে প্রজন্মগত উদ্বেগ, শাসনব্যবস্থার ক্লান্তি এবং স্বচ্ছ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে। এটি ক্ষমতায় রূপ নেবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকবে—যাই হোক, ২০২৬ ইতোমধ্যেই তামিলনাড়ুর রাজনীতির ভাষা বদলে দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত