Ajker Patrika

রয়টার্সের প্রতিবেদন /রেডিওলজিক্যাল–রাসায়নিক যুদ্ধে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীন, বেইজিং বলছে ‘ভিত্তিহীন’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
রেডিওলজিক্যাল–রাসায়নিক যুদ্ধে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীন, বেইজিং বলছে ‘ভিত্তিহীন’
২০১৬ সালের এক মহড়ায় পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গন করছেন চীন ও রাশিয়ার দুই মেরিন সদস্য। ছবি: সিনহুয়া

গত বছর রুশ বাহিনীকে চীনের গোপন সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে অনুমোদন করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ কার্যক্রমে অন্তত চারজন রুশ ও চীনা জেনারেল সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন দুই ইউরোপীয় কর্মকর্তা। এ ছাড়া রয়টার্সের দেখা নথিপত্র থেকেও এই তথ্য জানা গেছে।

কর্মকর্তারা বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে এত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা দেখায় যে রাশিয়া ও চীনের কাছে এই সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বেইজিং এ ধরনের প্রশিক্ষণের ঘটনা অস্বীকার করেছে, বিষয়টি ইউরোপে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে রয়টার্সের দেখা এক গোপন রুশ নথিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভের জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনার কথা।

ওই নথিতে বলা হয়, বেলৌসভের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রুশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল প্রশিক্ষণ মহড়ায় অংশ নিতে চীনে যায়। এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয় পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর বিভিন্ন স্থাপনায়।

রেডিওলজিক্যাল, জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণ

একই প্রতিবেদনে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, নভেম্বর মাসে বেইজিংয়ের একটি সামরিক স্থাপনায় তিন সপ্তাহব্যাপী রেডিওলজিক্যাল, রাসায়নিক ও জৈবিক সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই প্রতিবেদন এবং আরেকটি প্রতিবেদনে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণের ছবি ও বর্ণনা রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, একজন চীনা প্রশিক্ষক রুশ সেনাদের পাঠ দিচ্ছেন, তারা একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের মডেল পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ‘রাসায়নিক অনুসন্ধান’, ‘বিকিরণ অনুসন্ধান’ এবং দূষণ থেকে বায়ুচলাচল ব্যবস্থা সুরক্ষার কৌশল শিখছেন।

ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের একজন বলেন, প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে রেডিওলজিক্যাল, জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এ বিনিময়ের কৌশলগত গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। তাঁর মতে, সাধারণভাবে সামরিক বাহিনীগুলোর জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব দেয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকট নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ক্ষেত্রে চীন নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করে এবং শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও নিজেদের উপস্থাপন করে। গত মাসে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক নথির উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, নভেম্বর মাসে চীন প্রায় ২০০ রুশ সামরিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেয়। তাঁদের মধ্যে কিছু সদস্য পরবর্তীতে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেন। ক্রেমলিন ওই প্রতিবেদনে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ভুল তথ্য’ নিয়ে অভিযোগ তোলে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাইয়া কালাস ১৫ জুন বলেন, ব্রাসেলস নিজস্ব সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি হয়েছিল এবং এখন এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বেইজিং তাঁর মন্তব্যকে ‘শুধুই অপপ্রচার’ বলে বর্ণনা করে।

গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনকে ঘিরে ইইউর ভাবনা

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে নিজেদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। একই সময়ে মস্কো ও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি তারা সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ২৭ সদস্যের এই জোটের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এখন প্রশ্ন উঠছে, এই প্রশিক্ষণের প্রতিক্রিয়ায় আরও কোনো পদক্ষেপ প্রয়োজন কি না। কারণ, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।

রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক এক তৃতীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, চীনকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বন্ধ করতে হবে। বরং কাজা কালাস যেভাবে বলেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধের ক্ষেত্রে চীনের “নির্ধারক সহায়ক” ভূমিকায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা দুই ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানান, প্রশিক্ষণের ভিত্তি তৈরি করা ২ জুলাইয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন রুশ মেজর জেনারেল রুস্তাম খুসাইনভ এবং চীনের সিনিয়র কর্নেল সান দাইইউন। রাশিয়ার পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই কার্তাপোলোভ রুশ সংবাদমাধ্যম আরটিভিআইকে বলেন, প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রতিবেদনটি ‘পুরোপুরি অর্থহীন’ এবং রুশ সেনাবাহিনীর চীনের কাছ থেকে শেখার কিছু নেই।

যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় চীনের সীমাবদ্ধতা

ইউক্রেন যুদ্ধে চার বছরের বেশি সময় ধরে লড়াইয়ের মাধ্যমে রাশিয়া ব্যাপক যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে বিশাল ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও চীন কয়েক দশক ধরে কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি। রয়টার্সের দেখা রুশ সামরিক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণের শক্তি ও দুর্বলতা দুটিই উল্লেখ করা হয়েছে।

নানজিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি প্রতিবেদনে সরঞ্জামের মান, সিমুলেটর ব্যবহার এবং প্রশিক্ষকদের উচ্চতর তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে চীনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য নথিগুলোতে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া আরও তিন জেনারেলের নাম উঠে এসেছে। রয়টার্সের দেখা একটি রুশ সামরিক নথিতে সব প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের পূর্ণ তালিকা ছিল। সেখানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নাম, পদমর্যাদা, জন্মতারিখ, সংশ্লিষ্ট ইউনিট এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্রের স্তরও উল্লেখ করা হয়।

তালিকা এবং আরেকটি সামরিক নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার স্থলবাহিনীর উপপ্রধান কর্নেল জেনারেল রুস্তাম মুরাদভ রুশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। অন্য নথি অনুযায়ী, পিএলএর রেডিওলজিক্যাল, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রতিরক্ষা সামরিক একাডেমির প্রধান চীনা মেজর জেনারেল লি চিনসুন প্রশিক্ষণের একটি কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের তালিকা অনুযায়ী, রুশ মেজর জেনারেল ভিতালি গেরাসিমভ বেংবুতে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত