Ajker Patrika

ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছেন কি পুতিন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪৭
ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছেন কি পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততা নিয়ে আরও বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের দাবি, ক্রেমলিন এখন যুদ্ধকে ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে ন্যাটোর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা জোরদার করছে, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং সামরিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যা রুশ জনগণের কাছে তুলে ধরা যায়।

সম্প্রতি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, সামরিক পোশাক পরিহিত পুতিন রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভের কাছ থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং নেন। গেরাসিমভ বলেন, স্থলযুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় কিয়েভ সরকার তাদের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্যোগ নিজেদের হাতে নিয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

জবাবে পুতিন বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার ঘোষিত ‘ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ’ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধে প্রতিটি পশ্চিমা দেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিশ্লেষণ চালিয়ে যেতে হবে। পুতিন বলেন, ‘ভবিষ্যতে সম্ভাব্য দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমাদের এই বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।’

ভিডিওটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের ছুটি শুরুর আগে প্রকাশ করা হয়। পুতিন ওই ভিডিওতে দাবি করেন, রুশ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা পূর্ব ইউক্রেনের কস্তিয়ান্তিনিভকা শহর ‘সম্পূর্ণ মুক্ত’ করেছে। তবে ইউক্রেন এখনও শহরের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনকে সেখানে এসে সাক্ষাৎ করে যুদ্ধের অবসানে ‘কূটনৈতিক সমাধান’ খোঁজার আহ্বান জানান।

পুতিন আরও দাবি করেন, চলতি বছরে রাশিয়া ইউক্রেনে ‘আমাদের ভূমি’ হিসেবে উল্লেখ করা ৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা দখল করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) যাচাইকৃত ও জিওলোকেটেড তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধরেখার পরিবর্তন এবং ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের কারণে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাশিয়ার প্রকৃত অগ্রগতি ছিল মাত্র ৯৭ বর্গকিলোমিটার।

আইএসডব্লিউর মতে, পুতিন বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তে এমন একটি ‘নির্মিত বাস্তবতা’ তৈরি করছেন, যা যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগত ও অপারেশনাল বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। সংস্থাটি বলেছে, তথ্যপ্রবাহের ওপর পুতিনের নিয়ন্ত্রণ এবং রুশ সামরিক সাফল্যের বর্ণনা তৈরি ও প্রচারের সক্ষমতাই এই বর্ণনাকে টিকিয়ে রাখার মূল উপাদান।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাশিয়া প্রায়ই কোনো শহর বা গ্রাম দখলের দাবি করে তখনই, যখন সৈন্যরা কেন্দ্রীয় চত্বর বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছে রুশ পতাকা স্থাপন করে তার ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়। পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তিন বছর যুদ্ধ করা ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য আন্দ্রি নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করে আল জাজিরাকে বলেন, ‘তারপর আমরা তাদের মেরে ফেলি, আর তারা আর কখনও ফিরে যেতে পারে না।’

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, পুতিনের লক্ষ্য রুশ জনগণকে বোঝানো যে ন্যাটোর সমর্থনের কারণেই কয়েক মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকা ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ এখন পঞ্চম বছরে গড়ানো একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

রোমানেঙ্কো বলেন, ক্রেমলিনকে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে কেন যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং কেন এটি এখন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, বাল্টিক অঞ্চল থেকে পশ্চিম সাইবেরিয়া পর্যন্ত রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড ও অধিকৃত এলাকায় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ক্রেমলিন সেপ্টেম্বরের ১৮ থেকে ২০ তারিখের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে সম্ভাব্য আংশিক সেনা সমাবেশের জন্য জনমত প্রস্তুত করছে।

রোমানেঙ্কোর ভাষ্য, ‘রাশিয়া সক্রিয় যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, হামলা অব্যাহত রাখবে এবং নির্বাচনের পর অন্তত আংশিক সেনা সমাবেশ করবে, যা ইতোমধ্যেই পরিকল্পিত।’

পুতিন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘আংশিক সেনা সমাবেশ’ ঘোষণা করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টার কারণে সেই কর্মসূচি অনেকাংশে স্থগিত ছিল। পশ্চিমা ‘পৃষ্ঠপোষকদের’ নিয়ে পুতিনের বক্তব্যের একদিন পর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অথচ এই শব্দ ব্যবহারের কারণে অতীতে হাজার হাজার রুশ নাগরিক জরিমানা, গ্রেপ্তার এবং কারাদণ্ডের মুখে পড়েছেন।

পেসকভ বলেন, ‘এটি একটি যুদ্ধ, সত্যিকারের যুদ্ধ। সবকিছু শুরু হয়েছিল একটি বিশেষ সামরিক অভিযান হিসেবে। কিন্তু এটি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, কারণ কিয়েভের পেছনে রয়েছে বার্লিন, প্যারিস, দ্য হেগ, অসলো এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওয়াশিংটন।’

কিয়েভভিত্তিক পেন্টা থিংক ট্যাংকের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, রাশিয়া যখনই যুদ্ধক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে, সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়, রুশ ভূখণ্ডে হামলা বাড়ে, ক্রিমিয়া ও জ্বালানি সংকট নিয়ে চাপ তৈরি হয়, তখন ক্রেমলিনকে জনগণের কাছে এর ব্যাখ্যা দিতে হয়। তাঁর মতে, রাশিয়া কখনও স্বীকার করতে চায় না যে ইউক্রেন আরও কার্যকর বা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বরং তারা পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এমন বর্ণনাই সামনে আনে, যাতে দীর্ঘদিনেও ইউক্রেনকে পরাজিত করতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করা যায়।

রাশিয়ার অন্যতম ধারাবাহিক দাবি হলো, ইউক্রেন ক্রমশ ন্যাটোর সঙ্গে আরও বেশি একীভূত হচ্ছে এবং ন্যাটো ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ২৯ জুন দাবি করেন, ন্যাটো ইউক্রেনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করছে, যা দিয়ে রাশিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের ‘আশাহীন অবস্থান’ রক্ষার চেষ্টায় কিয়েভ ন্যাটোকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে টেনে আনছে।

তবে ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যরা এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পূর্ব ইউক্রেনে দায়িত্ব পালন শেষে ছুটিতে থাকা ড্রোন অপারেটর ইহোর আল জাজিরাকে বলেন, ‘তারা নিজেদের মুখরক্ষা করতে চায় এই ভান করে যে সফল হচ্ছে ইউক্রেনীয়রা নয়, বরং পুরো পশ্চিমা সভ্যতার সম্মিলিত বাহিনী, যারা নাকি তাদের তেল ও তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ কেড়ে নিতে চায়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত