দাসপ্রথার জন্য ক্ষমা চাইতে পারি, তবে ক্ষতিপূরণ নয়: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

আটলান্টিক দাসব্যবসায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। তবে এর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিটি নাকচ করেছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এ বিষয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
গার্ডিয়ানের নিবন্ধে বার্নহাম দাসপ্রথাকে একটি ‘নৃশংস ও বর্বর অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লেখেন, আমাদের অতীত ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার যে দাবি উঠেছে, বিষয়টি তিনি বিবেচনা করতে প্রস্তুত আছেন।
তবে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি প্রসঙ্গে অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, বহু বছর আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন আইন ও সময়ে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক অপরাধের জন্য আজকের দিনে ব্রিটিশ নাগরিকদের কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। কারণ এতে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
বার্নহাম বলেন, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো বহু বছর ধরে এ বিষয়ে একটি আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তিনি একটি কাঠামোবদ্ধ সংলাপের প্রস্তাব দেন। ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবিগুলো শোনা এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে এবং তিনি এ দাবির বিষয়ে ‘উন্মুক্ত’।
উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার দাসপ্রথার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো প্রস্তাবও দেয়নি। বার্নহামও তাঁর পূর্বসূরিদের নীতি অনুসরণ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নাকচ করেছেন।
এদিকে আগামী সপ্তাহে ক্যারিবীয় অঞ্চলে কমনওয়েলথ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন শুরু হবে। ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস বর্তমানে ওই অঞ্চল সফর করছেন। তাঁর সফর ঘিরে দাসপ্রথার জন্য ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবিটি নতুন করে জোরালো হয়েছে।
বার্নহামের নিবন্ধটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ চ্যান্সেলর জন হিলি বিবিসিকে বলেন, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য আমরা প্রস্তুত। কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনের আগে এমন আলোচনা করা সঠিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে হিলি স্পষ্ট করেন, বার্নহাম মনে করেন না যে, ক্ষতিপূরণই সঠিক পদ্ধতি। কয়েক শত বছর আগে সংঘটিত ঘটনায় বর্তমান ব্রিটিশ নাগরিকদের আর্থিক দায় নেওয়া উচিত নয়।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনকও বার্নহামের অবস্থানকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, বর্তমান ব্রিটিশ করদাতাদের এমন ঘটনার জন্য আর্থিকভাবে দায়ী করার কোনো কারণ নেই। বর্তমান প্রজন্মের জন্মের বহু আগে এ ঘটনা ঘটেছে।
তবে যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মোটলি প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বসার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তাঁরা ইতিবাচকভাবে এতে অংশ নেবেন। তবে তাদের ন্যায়বিচারের দাবি অব্যাহত থাকবে।
অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ ফর আফ্রিকান রিপারেশনস (এপিজিজি) নেতা বেল রিবেরো-অ্যাডি বলেন, যুক্তরাজ্যের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের কোনো আনুষ্ঠানিক দাবি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানেন না। ফলে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা করা মূল বিষয়টিকেই আড়াল করার চেষ্টা।
অন্যদিকে দ্য রিপেয়ার ক্যাম্পেইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ডেনিস ও’ব্রায়েন বার্নহামের বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ সরকারের উচিত বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া।
১৬শ শতাব্দী থেকে শুরু করে শত শত বছর ধরে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও সরকার দাস ব্যবসায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। পরবর্তীকালে ১৮৩৩ সালে আইন পাসের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হলেও, সেই সময় দাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল ব্রিটেন। সেটা পরিশোধ হয় ২০১৫ সালে। এর আগে ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার দাসপ্রথায় ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।









