Ajker Patrika

ব্রিটেনে মে-জুনের তীব্র গরমে আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ব্রিটেনে মে-জুনের তীব্র গরমে আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে
গত জুন ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। ছবি: পিএ

যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গত মে-জুন মাসের তীব্র দাবদাহে গরম-জনিত নানা উপসর্গে দুই হাজার সাতশরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, দেশটির আবহাওয়া দপ্তর এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের একদল গবেষকের যৌথ মূল্যায়নে এই তথ্য উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এই আবহাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা একটি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা সুস্থ-সবল মানুষের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

গবেষকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনুমিত মৃত্যুর সিংহভাগই ঘটেছে গত জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহের সময়। এটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উষ্ণতম মাস ছিল। এই সময় নরফোকের লিংউড এলাকায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (৯৯.৯ ফারেনহাইট) পৌঁছায়, যা ১৯৫৭ সালের পুরোনো রেকর্ডকে ভেঙে দেয়। আবহাওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সে সময় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বেশ কিছু অংশে সর্বোচ্চ ‘রেড হিট অ্যালার্ট’ বা লাল সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ থেকে ২৯ মে-র মধ্যবর্তী সময়ে তীব্র গরমে প্রায় ৫৫০ জন এবং ১৮ থেকে ২৮ জুনের প্রচণ্ড দাবদাহে আরও প্রায় ২ হাজার ২০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৬ মে কিউ গার্ডেনসে মে মাসের তাপমাত্রা রেকর্ড ৩১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯২২ সালের আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মূলত ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয়ের কারণে এই চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট উচ্চচাপ বলয় দীর্ঘ সময় ধরে অঞ্চলের ওপর তপ্ত বাতাসকে আটকে রাখে। মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণ ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই হিট ডোম পরিস্থিতি আরও ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।

তীব্র গরমের পাশাপাশি রাতের বেলা ক্রান্তীয় অঞ্চলের মতো ভ্যাপসা গরম থাকায় সাধারণ মানুষের শরীর ঠান্ডা হওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। এর ওপর যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ ঘরবাড়ি শীতকালীন আবহাওয়ার উপযোগী করে তৈরি হওয়ায় সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার মতো অনুকূল নয়, যা বাসিন্দাদের আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলেছে।

চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড গরমে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হলে রক্ত সঞ্চালনের জন্য হৃদ্‌যন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়, ফলে মানবশরীরে প্রচণ্ড শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে। এতে করে শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ বা অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। এ ছাড়া বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় ঘামের মাধ্যমেও শরীর ঠান্ডা হতে পারছিল না।

ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফ্রেডি অটো বলেন, ‘এই চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিকে কেউ যেন অবমূল্যায়ন না করেন। আপনি কেবল ফিট এবং সুস্থ বলেই যে সম্পূর্ণ নিরাপদ, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।’ এই সংকটের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড নেট জিরো বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক এমিলি শাকবার্গ জানান, গত মাসে তীব্র দাবদাহের মধ্যেই তাঁর বাবা স্ট্রোক করেন। সে সময় অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় হাসপাতালে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা দেরি হয় এবং দুর্ভাগ্যবশত তিনি মারা যান।

গবেষকেরা মূলত পূর্ববর্তী বছরগুলোর মৃত্যুর রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের মে ও জুনের এই গাণিতিক মডেল বা সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যাটি বের করেছেন। তবে বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে কমও হতে পারে।

এই গবেষণা দলের সঙ্গে কাজ করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ডক্টর ক্লেয়ার বার্নস। ডক্টর ক্লেয়ার বলেন, ‘এই পূর্বাভাসের মাধ্যমে যদি আমরা মানুষকে সচেতন করতে পারি এবং তারা যদি পরবর্তী তাপপ্রবাহে নিজেদের সতর্কতা অবলম্বন করে, তবে আমাদের এই অনুমিত সংখ্যা ভুল প্রমাণিত হবে। কিন্তু এতেও আমরা খুশি হব। কারণ আমরা এত মানুষের মৃত্যু দেখতে চাই না।’

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালে মে-জুন মাসের গরমে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি পদক্ষেপের কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত হ্রাস করা না গেলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে উত্তর ইউরোপে শীতকালীন মৃত্যুর চেয়ে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত