Ajker Patrika

৪৫৫ শিশুর জীবন বাঁচাতে সর্বস্ব দান করলেন চীনা দম্পতি, ঘরে মিলল জরাজীর্ণ আসবাবপত্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
৪৫৫ শিশুর জীবন বাঁচাতে সর্বস্ব দান করলেন চীনা দম্পতি, ঘরে মিলল জরাজীর্ণ আসবাবপত্র
নিঃসন্তান দম্পতি দু ইংরং ও লু সুয়িং। ছবি: সংগৃহীত

জীর্ণ আসবাবপত্র, টেপ দিয়ে মেরামত করা চশমা আর ১৭ ইউয়ানের (প্রায় আড়াইশ টাকা) একটি দুপুরের খাবার দুজনে ভাগ করে খাওয়া—এমনই অতি সাধারণ ও মিতব্যয়ী জীবন ছিল চীনের এক নিঃসন্তান দম্পতির। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁরা যে অনন্য কীর্তি রেখে গেছেন, তা এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।

নিজেদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ ইউয়ান (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ কোটি টাকার সমতুল্য) জন্মগত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য দান করে গেছেন এই দম্পতি। তাঁদের এই মহৎ দানের ফলে অন্তত ৪৫৫ জন শিশুর জটিল হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে বলে গত মাসে সাংহাইয়ের এক প্রদর্শনীতে নিশ্চিত করেছেন দাতব্য কর্মকর্তারা।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই হৃদয়স্পর্শী তথ্য উঠে এসেছে।

একটি পোস্টার বদলে দিল জীবন

এই মানবিক গল্পের নেপথ্যে রয়েছেন দু ইংরং ও তাঁর স্ত্রী লু সুয়িং। দু পেশায় কলেজশিক্ষক ছিলেন এবং লু একই কলেজে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালে ৮১ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দু ইংরং এবং তাঁর স্ত্রী লু সুয়িং গত বছর (২০২৫ সালে) ৯২ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের শুরুর দিকে দু ইংরং সাংহাইয়ের ‘ইয়োদা কার্ডিওথোরাসিক হাসপাতাল’-এর সামনে একটি পোস্টার দেখতে পান। সেখানে জন্মগত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার সহায়তায় সাধারণ মানুষের প্রতি অর্থ সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছিল।

পোস্টারটি দেখার পর এই দম্পতি তাৎক্ষণিকভাবে ১০টি শিশুর চিকিৎসার জন্য ৫ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৭০ লাখ টাকা) দান করেন। এর কিছুদিন পর তাঁরা তাঁদের বাকি ৪৫ লাখ ইউয়ানও (প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা) একই তহবিলে দান করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই দম্পতির ঘরের পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালের দাতব্য প্রকল্পের এক কর্মী তাঁদের কিছু টাকা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কারণ তাঁদের ঘরটি ছিল অত্যন্ত পুরোনো ও জীর্ণ।

সেই অনুরোধের জবাবে দু ইংরং বলেছিলেন, ‘আমাদের দুজনেরই আর বেশি সময় বাকি নেই। আমরা পেনশনের টাকা পাই এবং আমাদের কিছু সঞ্চয়ও আছে। আমাদের এত টাকার কোনো প্রয়োজন নেই।’

নিজেদের কোনো সন্তান না থাকায়, এই দম্পতি তাঁদের আইনি অভিভাবক হিসেবে ‘সাংহাই ওভারসিজ চাইনিজ ফাউন্ডেশন’-কে নিযুক্ত করেছিলেন।

২০১৮ সালে দু এবং ২০২৫ সালে লুর মৃত্যুর পর ওই ফাউন্ডেশনের কর্মীরা তাঁদের ঘরে গিয়ে অবাক হয়ে যান। ঘরের আসবাবপত্রগুলো ছিল বহু পুরোনো, চশমাটি ছিল মেরামত করা। এমনকি তাঁরা দৈনন্দিন খরচের প্রতিটি হিসাব ডায়েরিতে লিখে রাখতেন।

অনেক সময় দু ইংরং মাত্র ১৭ ইউয়ানের একটি দুপুরের খাবার কিনে এনে তা দুজনে ভাগ করে খেতেন।

তবে জীবনযাপনে চরম মিতব্যয়ী হলেও এই দম্পতি মননে ছিলেন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁদের ঘরে ছিল বইয়ের বিশাল সংগ্রহ, সংবাদপত্রের ক্লিপিংস এবং অজস্র মিউজিক রেকর্ড। শুধু এই শেষ দানই নয়, দীর্ঘ বছর ধরে চীনের বিভিন্ন ভূমিকম্পের ত্রাণ তহবিল, শিক্ষা খাত এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণে তাঁরা নিয়মিত অর্থ দান করে গেছেন।

তাঁদের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তাঁদের মরদেহ সাগরে সমাহিত করা হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ কণ্ঠে জানান, এই দম্পতির রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার বা সম্পত্তি হলো সেই ৪৫৫টি শিশু, যাদের হার্ট এখন সুস্থভাবে স্পন্দিত হচ্ছে কেবল এই দম্পতির ভালোবাসায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত