Ajker Patrika

গাজাকে দুই ভাগ করতে মাটির বাঁধ নির্মাণ করছে ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১৩: ২১
গাজাকে দুই ভাগ করতে মাটির বাঁধ নির্মাণ করছে ইসরায়েল
প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে পাওয়া উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই দক্ষিণ গাজা স্ট্রিপে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একটি মাটির বাঁধ তৈরি করছে, যা আড়াআড়িভাবে চলে গেছে। এর একপাশে দুটি সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যপাশে ফিলিস্তিনিদের তাবু শহর মাওয়াসি অবস্থিত। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস

গাজা উপত্যকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ৫০ শতাংশেরও বেশি অংশকে বাকি এলাকা থেকে আলাদা করতে দ্রুতগতিতে বিশাল মাটির বাঁধ নির্মাণ করছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে ২৩ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি গাজার বিভিন্ন ফিলিস্তিনি জনপদের ওপর দিয়ে গেছে। এসব জনপদ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আগেই ধ্বংস করে দিয়েছে। গাজার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার হওয়ায় নির্মিত বাঁধটির দৈর্ঘ্য এর অর্ধেকেরও বেশি।

এপির দেখানো স্যাটেলাইট ছবি দেখে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে, তারা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা বরাবর একটি ভৌত বাধা তৈরি করেছে। এই ইয়েলো লাইনটি গত অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির সময় ইসরায়েলি সেনাদের পিছু হটার সীমারেখা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ওই চুক্তিতে এটিকে পূর্ণাঙ্গ ইসরায়েলি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত একটি অস্থায়ী বিভাজনরেখা হিসেবে ধরা হয়েছিল।

তবে যুদ্ধবিরতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এই অস্থায়ী বিভাজনরেখাই স্থায়ী সীমান্তে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং গাজার ভবিষ্যৎ তদারকির জন্য গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাঁধের পাশাপাশি তারা ইয়েলো লাইনের চারপাশে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তুলেছে। তবে এই বাধা কতদূর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সেনাবাহিনীর দাবি, এর উদ্দেশ্য অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং গাজার সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি সেনা ও বসতিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া।

প্ল্যানেট ল্যাবসের এই স্যাটেলাইট ছবিতে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই উত্তর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক একটি মাটির বাঁধ নির্মাণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বাঁধের বাঁয়ে রয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত বেইত লাহিয়া শহর এবং ডানে একটি অকেজো হওয়া সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস
প্ল্যানেট ল্যাবসের এই স্যাটেলাইট ছবিতে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই উত্তর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক একটি মাটির বাঁধ নির্মাণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বাঁধের বাঁয়ে রয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত বেইত লাহিয়া শহর এবং ডানে একটি অকেজো হওয়া সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, চলতি মাসে মাত্র দুই সপ্তাহে দক্ষিণ গাজার একটি অংশে বাঁধের দৈর্ঘ্য ৫০০ মিটার থেকে বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রাফাহ শহরকে আল-মাওয়াসি এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, যেখানে বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় তাবু শিবিরগুলোর কয়েকটি রয়েছে।

বর্তমান গতিতে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে এই অংশটি দক্ষিণের খান ইউনিস থেকে গাজা সিটির কাছাকাছি পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি বাঁধের সঙ্গে যুক্ত হবে। ওই অংশের নির্মাণ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছিল এবং এখনো দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। গাজার উত্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত বেইত লাহিয়া শহরের কাছেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন মাটির বাঁধ দেখা গেছে।

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইয়েলো লাইনের পশ্চিমের উপকূলীয় এলাকায় গাজার অধিকাংশ মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। তাদের বেশিরভাগই অস্বাস্থ্যকর তাবু শিবিরে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে ইয়েলো লাইনের পূর্বদিকে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ইসরায়েলি বাহিনী বুলডোজার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে অধিকাংশ ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কয়েকটি শহর এবং একসময় আড়াই লাখের বেশি মানুষের আবাসস্থল রাফাহ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে নতুন সড়ক, সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং কৃষিজমিও ব্যাপকভাবে নষ্ট করা হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হামাসের ব্যবহৃত অবকাঠামো ধ্বংস করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েলো লাইনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি এবং বাস্তবেও এটি সব জায়গায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত নয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা এখন এই সীমারেখা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার কাজ করছে, যাতে সংঘর্ষ কমে এবং নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

তবে এপির তথ্য অনুযায়ী, ইয়েলো লাইনের কাছে যাওয়া বা এটি অতিক্রম করার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু ও এমন বেসামরিক মানুষও রয়েছেন, যারা সম্ভবত এই সীমারেখা সম্পর্কে জানতেন না। কিছু ইসরায়েলি সেনা জানিয়েছেন, তারা সব সময় জানতেন না কাদের দিকে গুলি চালানো হচ্ছে এবং সীমারেখা অতিক্রমকারী যে কাউকে গুলি করার নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়েছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত