
ইরান যুদ্ধের লেলিহান শিখা এখনো সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করেনি, কিন্তু এর আঁচ ইতিমধ্যে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণী মহলে লাগতে শুরু করেছে। স্বল্প মেয়াদে চীনের হাতে কয়েক মাসের জ্বালানি তেল মজুত এবং রাশিয়ার সহায়তার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণ বেইজিংয়ের জন্য ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
বর্তমানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য রোডম্যাপ তৈরিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা চীনের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চীন তাদের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৯৯১ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে এনেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ আবাসনসংকট এবং ঋণের বোঝার ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
চীন আশা করেছিল, উচ্চ প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি রপ্তানির মাধ্যমে তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত চীনের জন্য নতুন আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য শুধু চীনের জ্বালানির প্রধান উৎসই নয়, এটি চীনের প্রধান শিপিং রুট বা পণ্য পরিবহনের পথও বটে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেটলার-জোনসের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আফ্রিকার মতো অঞ্চলগুলোকেও অস্থিতিশীল করবে, যেখানে চীন বিশাল বিনিয়োগ করে রেখেছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যদি তাদের পুঁজি গুটিয়ে নেয়, তবে চীনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউনের ভাষায়, চীন এখন বাকি বিশ্বের মতোই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে, আসল গেম প্ল্যান বা পরিকল্পনাটি কী?
ইরানকে দীর্ঘকাল ধরে চীনের ‘অবিচ্ছেদ্য মিত্র’ হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে এই সম্পর্কটি ছিল প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িক। ১৯৪৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দুই দেশ একটি ২৫ বছরমেয়াদি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যেখানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে তেলের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে চীন ইরান থেকে দৈনিক ১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা চীনের মোট আমদানির ১২ শতাংশ। তবে এই তেলের বড় অংশই মালয়েশিয়ার লেবেল লাগিয়ে উৎস গোপন করে আনা হতো। অভিযোগ রয়েছে, চীন কেবল তেল কেনেনি, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম এবং নজরদারি প্রযুক্তিতেও সহায়তা করেছে। কিন্তু বেইজিংয়ের জন্য এই জোট কোনো আদর্শিক ভিত্তি ছিল না, বরং আমেরিকাকে ব্যস্ত রাখার একটি হাতিয়ার মাত্র। চীন কখনোই পশ্চিমা দেশগুলোর মতো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বিশ্বাসী নয় এবং তাদের মিত্রের বিপদে সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো নজিরও নেই।
বর্তমান সংকটে চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘দায়িত্বশীল পাল্টা শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের ওপর হামলা এবং শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে ভেনেজুয়েলা এবং ইরানে ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ড চীনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। বেইজিংয়ের বলয়ের দেশগুলো যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তখন সে কেবল একজন দর্শক হয়ে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ফিলিপ শেটলার-জোনস মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও চীন এখনো বিশ্বজুড়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো সামরিক সুপারপাওয়ার হয়ে উঠতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে ক্ষমতা দেখাচ্ছে, চীন এখনো সেই পর্যায়ে নেই।
এই সংকটকে বেইজিং তাদের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপরীতে একজন ধীরস্থির নেতা হিসেবে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করছেন। চীনের যুক্তি হলো, ট্রাম্প আবারও পশ্চিমা দেশগুলোর ‘উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’র ভণ্ডামিকে প্রমাণ করেছেন। চীনের মতে, এই যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি ও খাদ্যসংকট পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বেইজিং এখন এই সুযোগে ওমান ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দূত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সব হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর। বেইজিং অত্যন্ত সতর্কভাবে পা ফেলছে, যাতে ট্রাম্পকে সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে একটি আলোচনার পথ খোলা রাখা যায়। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, দুই দেশের কর্মকর্তারা এই সফরের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করছেন। চীন হয়তো এই সফর থেকে বুঝতে চাইবে যে ট্রাম্প তাইওয়ান বা অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়ে কতটা কঠোর হতে পারেন। চীনের জন্য এই সংকট একাধারে ওয়াশিংটনকে ‘যুদ্ধবাজ’ হিসেবে চিত্রায়ণের সুযোগ এবং একই সঙ্গে ট্রাম্পের মতো একজন ‘অস্থির’ নেতাকে নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ। চীন এমন একটি বিশ্ব চায় না, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য বিস্তার করুক, কিন্তু তারা এমন একটি বিশ্বও চায় না—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একজন ভারসাম্যহীন ও অস্থির খেলোয়াড় হিসেবে কাজ করবে।
বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সঙ্গে প্রথাগত যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা নেই ইরানের। তারা কাজে লাগাচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধকালে ব্যাপক আলোচনায় আসা যুদ্ধকৌশল ‘নিবৃত্তকরণ’। যদি বর্তমান ক্ষতির পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতির আশঙ্কা হিসাব করে প্রতিপক্ষ পিছিয়ে যায়, তবেই এ কৌশল সফল হয়।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত। তবে পাল্টা হামলা থেমে নেই ইরানের। তাদের হামলায় বিপর্যস্ত ইসরায়েলিদের জনজীবনও। ইরানে মানুষ শহর থেকে গ্রামের দিকে ছুটছে। আর ইসরায়েলের মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন বাংকারে। জেরুজালেম, তেল আবিব, হাইফাসহ বিভিন্ন শহরেই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
৬ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে কার্যত ‘ধীরে চলো’ নীতিতে হাঁটছে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তেমন কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়নি দেশটি। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে নমনীয় ভাষায় সংঘাত বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছে চীন,
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানে মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এরই মধ্যে অফিস-আদালত খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তারা জানিয়েছে ২০ শতাংশ কর্মী আগামী রোববার থেকে অফিস করবেন। এদিকে হামলার আশঙ্কা থাকার পরও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্লাইট চালু হচ্ছে।
৬ ঘণ্টা আগে