Ajker Patrika

ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল আরব আমিরাত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩৪
ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল আরব আমিরাত
ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালীন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আরব আমিরাত। ছবি: প্রতীকী ছবি

ইরানের সেনারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে অভিযোগ করেছে দেশটি। তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই অভিযোগের পর ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আজ বুধবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এমন উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং আর্থিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’ এর আগে ইউএইর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। এর একটি ইউএইর আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে গিয়ে পড়েছে এবং অন্যটি দেশটির আঞ্চলিক জলসীমার ভেতরে পড়েছে।

পরে দেওয়া আরেক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ‘সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে’ ছোড়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তারা বলেছে, দেশের নিরাপত্তা কিংবা ওই অঞ্চলের নৌ-চলাচলব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা ‘দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’

ইরানের অস্বীকার

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউএইর অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধের মধ্যে এটি একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’ হতে পারে। অর্থাৎ, অন্য পক্ষের করা কোনো কর্মকাণ্ডের দায় ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।

বাঘাই সতর্ক করে বলেন, ইউএইর এই দাবি ‘সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে তেহরানের বিরুদ্ধে এমন ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকে দূরে থাকার’ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতির সৎ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড’ও বিবেচনায় নিতে হবে।

মার্কিন নৌ অবরোধ

ইউএইর বিরুদ্ধে মঙ্গলবারের এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন এর ঠিক এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের বয়স এখন পাঁচ মাসেরও বেশি। যুদ্ধের প্রথম ছয় সপ্তাহে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইউএইকেই সবচেয়ে বেশি পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। ইরান ওই সময় ইউএইতে ৫৩০ টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০ টির বেশি ড্রোন ছুড়েছিল। তেহরানের দাবি ছিল, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইউএইতে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ।

মঙ্গলবারের হামলাটি ছিল মে মাসের পর ইউএইকে লক্ষ্য করে ইরানের প্রথম হামলা। এর কয়েক দিন আগেই আবুধাবি অভিযোগ করেছিল, হরমুজ প্রণালিতে তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি অ্যাডনক-এর দুটি জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। তবে অ্যাডনকের ওই দুটি জাহাজে হামলার দায় ইরান স্বীকার করেনি।

অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইউএইর এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে এখন সামরিক চাপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে পারে ওয়াশিংটন।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল এবং দেশটির সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট আল জাজিরাকে বলেছেন, ইউএইর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ওয়াশিংটনের আরোপ করা যেকোনো নিষেধাজ্ঞার চেয়েও ইরানের ওপর বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। এর কারণ, দুবাই নীরবে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। কিমিটের মতে, চীন ও তুরস্ককেও পেছনে ফেলে দুবাই এখন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর একটি। ইরান প্রতি বছর যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে দুবাই।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর, মার্চের শুরুতেই ইউএই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে জুনের শেষ দিকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়ে আবার বাণিজ্য শুরু হয়। কিমিট বলেন, ইরান ও দুবাইয়ের মধ্যে পণ্য ও অর্থের যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তার গুরুত্ব কোনোভাবেই বাড়িয়ে বলা সম্ভব নয়, আবার কমিয়েও দেখা যায় না।

এই নির্ভরতা শুধু সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুবাই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে গোপনে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দিয়ে এসেছে। কিমিটের ভাষায়, দুবাইয়ের এই আর্থিক ব্যবস্থা ইরানকে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ সরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইউএই যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো কি একই পথে যাবে

তবে কিমিট মনে করেন না যে অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো এখনই ইউএইর পথ অনুসরণ করবে। তাঁর ধারণা, ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলেও অন্য দেশগুলো আপাতত ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার’ নীতি অনুসরণ করবে। তবে তিনি বলেন, ইউএইর সিদ্ধান্ত এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তেহরান এটিকে যুদ্ধ ঘোষণার কাছাকাছি কোনো পদক্ষেপ হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারে। কিমিট এ পরিস্থিতির সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জাপানের বিরুদ্ধে আরোপ করা প্রায় পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার তুলনা করেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত