Ajker Patrika

ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক ফ্রান্সের স্কুলশিক্ষার্থীদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক ফ্রান্সের স্কুলশিক্ষার্থীদের
শিক্ষার মান বৃদ্ধি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানো এবং শিক্ষক সংকট দূরীকরণের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ছবি: এএফপি

শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও উন্নয়নের দাবিতে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্সের স্কুলশিক্ষার্থীরা। তাদের এই আন্দোলন রূপ নিয়েছে দেশব্যাপী বিক্ষোভে। স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার দেশটিতে বড় ধরনের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। এ দিকে ফ্রান্স সরকার বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত রয়েছে তারা।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলমান এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়গুলোর সামনে অবরোধ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এগিয়ে এলে সংঘর্ষে অন্তত ১৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সোমবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে গেছে। এর আগে গত সপ্তাহে আরেক শিক্ষার্থী মাথায় কাঁদানে গ্যাসের একটি গ্রেনেডের আঘাত লেগে গুরুতর আহত হয়।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পূরণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান আয়োজক ইউনিয়ন সঁদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) বলেছে, সরকার ‘কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি’।

সংগঠনটি মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, ‘এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন’ হিসেবে তারা যা বর্ণনা করছে, তার বিরুদ্ধে এই কর্মসূচি পালন করা হবে।

শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও কয়েকটি সংগঠনও সমর্থন জানিয়েছে। শিক্ষকদের ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউ তাদের সদস্যদের মঙ্গলবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই)–এর নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এই বিক্ষোভকে ১৯৬৮ সালের পর ‘হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে শক্তিশালী যুব আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল এবং ওই সময় লাখ লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে গিয়েছিলেন।

সেপ্টেম্বরে প্যারিসে বিক্ষোভের শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন। এর মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার মতো বিষয়। প্রথমে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন শুরু করেন। পরে তাঁদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন।

রোববার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নো ‘মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের নানা সমস্যার সমাধানে’ একগুচ্ছ পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। স্কুলগুলোতে ‘দৃশ্যমান পরিবর্তন’ আনার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, ‘সহিংসতার ব্যাপারে আমরা কোনো ছাড় দেব না। হামলার শিকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের পাশাপাশি আহত পুলিশ কর্মকর্তা ও জেনদার্মদের পাশে আমরা আছি।’

বিক্ষোভের সময় শুধু স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধই করা হয়নি, ময়লার বিনেও আগুন দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ২৪টি স্কুলে ‘আগুন দেওয়া ও ভাঙচুর’ করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত চলা বিক্ষোভে শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সোমবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসের একটি স্কুলের কাছে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই শিক্ষার্থীকে কাছের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁর আঘাত জীবনসংহারী নয়।

গত সপ্তাহে সাঁ-ওয়াঁ-লো-মোন এলাকায় ১৪ বছর বয়সী এদেন গুরুতর আহত হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাঁদানে গ্যাসের একটি গ্রেনেড তাঁর মাথায় আঘাত করেছিল। এদেনের আইনজীবী জানিয়েছেন, তার ‘চোয়ালের দুটি হাড় ভেঙে গেছে’ এবং তাকে ‘অত্যন্ত বড় ধরনের অস্ত্রোপচার’ করাতে হয়েছে।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এদেনের মা বলেন, তাঁর হৃদয় ‘ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে’। ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভি তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘এটি লজ্জাজনক, ভয়াবহ, সহিংস এবং আতঙ্কজনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা হওয়া উচিত নয়। তারা এমন শিশুদের সঙ্গে আচরণ করছে, যারা পড়াশোনার জন্য আরও ভালো পরিবেশের দাবি জানাচ্ছে।’

ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ৫ হাজার ৬০ জনের মধ্যে ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ জনকে বিচার-পূর্ব আটক রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৮০২ জনের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ৩১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ করেছে ইউএসএল। গত সপ্তাহে এ অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, বিক্ষোভগুলোতে পুলিশ ‘অত্যন্ত মাত্রাসম্মতভাবে’ দায়িত্ব পালন করেছে।

ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখনো কয়েক মাস দূরে। তবে বিক্ষোভ এবং এর জবাবে ফরাসি কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সরকার ও কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকেরা বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য কট্টর বামপন্থীদের দায়ী করেছেন। লেকর্নো বলেন, আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই) ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আচরণ করছে।

কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মেরিন ল্য পেনও বিক্ষোভ নিয়ে বামপন্থীদের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এটি আর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পেশাদারদের সংগঠিত দাঙ্গায় পরিণত হয়েছে, যার তদারকিতে রয়েছেন লা ফ্রঁস ইনসুমিজের আইনপ্রণেতারা।’ তিনি নতুন করে দাঙ্গাবিরোধী আইন পাস করার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে এলএফআইয়ের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ পুলিশকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের’ জন্য দায়ী করেছেন। ‘তরুণদের বিক্ষোভ রক্ষা করতে’ জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

বামপন্থী মেয়র বেনোয়া পায়াঁ মার্সেই শহরে সংঘটিত ‘অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ ও সরকারি সেবা নিয়ে ‘যথার্থভাবেই উদ্বিগ্ন’। তবে তাঁদের অবশ্যই শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত