Ajker Patrika

ইরানে আগ্রাসনের পক্ষে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের অনেকে, চাওয়া—আগে হামলা করুক ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ৫৭
ইরানে আগ্রাসনের পক্ষে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের অনেকে, চাওয়া—আগে হামলা করুক ইসরায়েল
ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই চান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর আগে ইসরায়েল আঘাত হানুক। চলমান আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুজন ব্যক্তি এই তথ্য জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এসব কর্মকর্তা গোপন আলোচনায় বলছেন, যদি ইসরায়েল আগে হামলা করে, তাহলে ইরান পাল্টা জবাব দেবে। এতে হামলার পক্ষে মার্কিন জনগণের সমর্থন জোগাড় করা সহজ হবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য। অর্থাৎ ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার কোনো মিত্রকে আগে আঘাত করে, তাহলে আমেরিকান ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলাকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করবেন।

এই হিসাবটি মূলত রাজনৈতিক। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক আমেরিকান, বিশেষ করে রিপাবলিকানরা ইরানে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে। কিন্তু তারা এই লক্ষ্যে কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি নিতে চান না। তাই ট্রাম্পের দল শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো যুক্তিই বিবেচনা করছে না, বরং হামলাটি কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেটিও ভাবছে।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রশাসনের ভেতরে ও আশপাশে এমন ভাবনা আছে যে ইসরায়েল যদি একা আগে হামলা করে এবং ইরান আমাদের ওপর পাল্টা আঘাত হানে, তাহলে আমাদের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক বেশি অনুকূল হবে।’

ওয়াশিংটনে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক সমাধানের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কখন এবং কীভাবে হামলা চালাবে। যদিও ইসরায়েল আগে পদক্ষেপ নিক—এমন ইচ্ছা রয়েছে, তবু সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান, এমনটি বলেছেন ওই দুই ব্যক্তি।

মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘মিডিয়া প্রেসিডেন্টের ভাবনা নিয়ে যত খুশি জল্পনা করতে পারে, কিন্তু তিনি কী করবেন বা করবেন না, তা শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই জানেন।’ ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে যান। তিনি প্রশাসনের ওপর চাপ দেন, যেন তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং অঞ্চলে তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। এদিকে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ আলোচক দল, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আজ বৃহস্পতিবার জেনেভায় যাচ্ছেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত প্রথম ব্যক্তি বলেন, এটি একটি গুরুতর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। তবে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ধারণা হচ্ছে, ‘আমরা তাদের বোমা মারতে যাচ্ছি।’ তবে হামলার পরিসর নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি বলেন, দুটি বড় বিষয় বিবেচনায় আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। প্রশাসনের আশঙ্কা, এতে চীন তাইওয়ান নিয়ে সুযোগ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি সবচেয়ে আক্রমণাত্মক বিকল্প নেওয়া হয়, তাহলে মার্কিন প্রাণহানির সম্ভাবনা।

তিনি বলেন, ‘যদি শাসন পরিবর্তনের মতো বড় পরিসরের হামলা হয়, তাহলে ইরান তাদের সব শক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। আমাদের অঞ্চলে অনেক সম্পদ ও স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। এগুলো আয়রন ডোমের সুরক্ষায় নেই। ফলে মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি খুব বেশি। আর এর সঙ্গে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িত।’

স্বাভাবিক সময়েও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সেনা মোতায়েন থাকে। এখন ট্রাম্প দুটি বিমানবাহী রণতরি হামলা-গোষ্ঠী, ডজনখানেক যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান পাঠিয়েছেন। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে এটিই সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক শক্তি সমাবেশ।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এবং কংগ্রেসের সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ইরান হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মার্কিন স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

তেহরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের হাতে বিভিন্ন বিকল্প আছে। ইরানবিষয়ক আলোচনায় পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে সীমিত পরিসরের হামলা চালিয়ে তা চাপ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, যাতে ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য একটি চুক্তিতে রাজি হয়। যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে পরে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প।

সামরিক বিকল্পগুলোতে প্রায় নিশ্চিতভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে অথবা গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যা অবশিষ্ট আছে। ইসরায়েল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করে। তাই সেটিও লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শাসনব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাতের ক্ষেত্রে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নেতৃত্বে সরাসরি হামলার বিকল্পও আছে। এর অর্থ, ইরানের প্রবীণ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করা। তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা শুধু একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। উচ্চপদ শূন্য হলে সেখানে অন্যদের বসানোর কাঠামো তাদের আছে। তবু যুক্তরাষ্ট্র সরকারি বিভিন্ন স্তর এবং শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের শীর্ষ নেতৃত্বসহ একাধিক স্তরে আঘাত হানতে পারে।

এ ধরনের অভিযান কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে যদি কেবল আকাশপথে হামলার ওপর নির্ভর করা হয়, তাহলে ফলাফল অনিশ্চিত হতে পারে। গত জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু সাধারণ ইরানিদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারা যেন সুযোগ নিয়ে শাসকদের উৎখাত করে।

হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান মাইক রজার্স বলেন, বুধবার সকালে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি একটি ব্রিফিং পেয়েছেন। সেখানে ইরান কীভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, প্রমাণ স্পষ্ট এবং তা সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে শক্ত যুক্তি তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘তারা ওই সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছে।’

তবে এই গোপন তথ্য কবে জনসমক্ষে আনা হবে, তা বলতে পারেননি রজার্স। প্রতিনিধি ডন বেকন বলেন, আইনপ্রণেতাদের শিগগির পারমাণবিক হুমকি বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানানো হবে। তবে কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা এখনো কোনো ব্রিফিং পাননি এবং তাদের প্রশ্নের জবাব কবে দেওয়া হবে, তা-ও জানানো হয়নি। ইরান সরকার দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে তারা বলছে, বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার তাদের আছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দিহান, বিশেষ করে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বিবেচনায়।

মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলেও ইরান সরকারের একজন কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত