Ajker Patrika

নেপাল বিপর্যয়ের ৫ মাস আগেই দেওয়া হয়েছিল বিপদের ইঙ্গিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নেপাল বিপর্যয়ের ৫ মাস আগেই দেওয়া হয়েছিল বিপদের ইঙ্গিত
ছবি: এএফপি

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত কয়েক দিনের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে কয়েক শ মানুষের মৃত্যু এবং হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে পাঁচ মাস আগের দুটি গবেষণা প্রতিবেদন। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমড) গত মার্চ মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল—হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলছে, বরফের পুরুত্ব আশঙ্কাজনক হারে কমছে এবং এর ফলে ভাটিতে বসবাসকারী প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ঠিক কী কারণে নেপালের এই বিপর্যয় ঘটেছে। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে তাঁরা মনে করছেন, হিমালয় অঞ্চলে একটি বরফ-শিলা ধস (আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ), দ্রুত হিমবাহ গলন, পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে পড়া এবং উষ্ণ আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব এই দুর্যোগের পেছনে কাজ করেছে।

পাঁচ মাস আগে কী বলেছিল আইসিমড

আইসিমডের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো। সংস্থাটি মার্চ ২০২৬ সালে দুটি পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এগুলো হলো—

‘Changing Dynamics of Glaciers in the Hindu Kush Himalaya Region (1990–2020)’

‘HKH Glacier Outlook 2026: Insights from 50 Years of Himalayan Glacier Monitoring’

প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের পর থেকে অনেক হিমবাহের বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পুরো হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং মোট বরফের প্রায় ৯ শতাংশ হারিয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহ গলার হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গবেষকদের ভাষায়, এটি ইঙ্গিত দেয় যে হিমালয়ের কিছু অংশ হয়তো এমন এক ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর দিকে এগোচ্ছে, যেখান থেকে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ আর থামানো সম্ভব হবে না।

কীভাবে ঘটল নেপালের ভয়াবহ বন্যা

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে স্থানীয় সময় প্রায় সকাল ৯টায় তিব্বত-নেপাল সীমান্তের লেন্দে খোলা উপত্যকায় বিশাল আকারের বরফ ও শিলা ধসে পড়ে। এর পর মুহূর্তেই কাদা, পাথর, বরফ ও পানির স্রোত ভোতে কোশি বা ত্রিশূলী নদীতে নেমে আসে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর পানি তীর উপচে আশপাশের জনপদ প্লাবিত করে।

নেপাল পুলিশের তথ্যমতে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সীমান্তবর্তী বাজার এলাকা।

নেপালের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢল প্রথমে ত্রিশূলী নদী সংলগ্ন এলাকায় আঘাত হানে। এরপর মানুষ, গবাদিপশু, ভবনসহ সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

নদীর পানি আধা ঘণ্টায় ৯ মিটার বেড়েছিল

আইসিমডের দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে খোলা।

আইসিমডের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, গত ১৪ মাসে লেন্দে খোলায় এটি দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের বন্যা। এবার একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও শিলা ধসে নদীর পানিপ্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয় এবং পরে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস

প্রথম দিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে বলেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানায়, যেটিকে প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে একটি হিমবাহ ধস ও এর সঙ্গে ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে সৃষ্ট কম্পন।

ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘটনাটি রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন সংকেত সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এটি ভূমিকম্প নয়; বরং বরফ ভেঙে পড়ার ফলে সৃষ্ট কম্পন।

স্যাটেলাইট ছবিতে কী দেখা গেছে

কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগার স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানান, আনুমানিক ০.২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি বিশাল বরফখণ্ড প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই উপত্যকার অনেক হিমবাহে থাকা তুষার দ্রুত গলে যায়। আগের দিনের ছবিতে যেসব অংশ তুষারে ঢাকা ছিল, পরদিন সেগুলো বরফে পরিণত হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় এলাকায় অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিরাজ করছিল।

পারমাফ্রস্ট দুর্বল হলে কেন বাড়ে ঝুঁকি

অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ম্যাকিন্টশ বলেন, এখনো নিশ্চিত নয় পুরো পাহাড় ধসে পড়েছে, নাকি শুধু হিমবাহের একটি অংশ ভেঙেছে। তিনি বলেন, একটি বড় হিমবাহ ধসে পড়লে বিপুল পরিমাণ পানি তৈরি হয়। এরপর সেই পানি কাদা, পাথর ও পলির সঙ্গে মিশে বিশাল ধ্বংসাত্মক ঢলে পরিণত হয়।

ম্যাকিন্টশ ব্যাখ্যা করেন, পাহাড়ের চিরহিমায়িত মাটি বা পারমাফ্রস্ট একধরনের প্রাকৃতিক আঠার মতো কাজ করে, যা খাঁড়া ঢালে পাথর ও বরফকে ধরে রাখে। তাপমাত্রা বাড়লে এই পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে যায়, ফলে পাহাড় ও হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে তুষারপাত কমে বৃষ্টি বাড়ছে, হিমবাহ দ্রুত সরে যাচ্ছে এবং বরফের বদলে খোলা পাথুরে ভূমি বেড়ে চলেছে।

আইসিমডের জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ও আইআইটি ইন্দোরের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, তুষারের আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় উন্মুক্ত শিলাস্তর বেশি তাপ শোষণ করছে। এতে পাহাড়ের ঢাল আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ধসের সম্ভাবনা বাড়ছে। তিনি বলেন, চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে। তবে প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে হিমবাহ সরে যাওয়া, কম তুষারপাত এবং পারমাফ্রস্টের অবক্ষয় এই বিপর্যয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

আইসিমডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বরফ রয়েছে হিন্দুকুশ-হিমালয়ে। এখানে ৬৩ হাজার ৭০০টির বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

এই হিমবাহগুলো থেকেই উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থা, যার মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু অববাহিকাও রয়েছে। এসব নদীর পানি কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জীবিকার প্রধান উৎস।

আইসিমডের গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হিমবাহ এলাকার অন্তত ৭৮ শতাংশ অংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইসিমডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণে এখনো বড় ধরনের তথ্যঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ৩৮টি পর্যবেক্ষণাধীন হিমবাহের মধ্যে মাত্র সাতটি বিশ্ব গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের মানদণ্ড পূরণ করেছে।

কারাকোরাম, সিকিম, জান্সকার ও ভুটানের মতো বিশাল হিমবাহসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর অনেক অংশ এখনো কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়েছে। ফলে বিপদের আগাম পূর্বাভাস দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আগেও ঘটেছে এমন বিপর্যয়

হিমালয়ে হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখন্ডে একটি হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। সেই ঘটনায় ২০০ জন নিহত হন। পরে এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২৭ মিলিয়ন ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফ ধসে বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এবারের নেপাল বিপর্যয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার কারণে হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নেপালেই ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

‘এটি শুধু নেপালের সংকট নয়’

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল-তিব্বতের এই বিপর্যয় কেবল একটি দেশের দুর্যোগ নয়। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা। কারণ হিন্দুকুশ-হিমালয়ের হিমবাহগুলোকে বলা হয় ‘এশিয়ার জলাধার’। এখানকার বরফ দ্রুত গলে গেলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধুসহ বহু নদীর প্রবাহ, কৃষি উৎপাদন, পানির নিরাপত্তা এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত